১৩টি টেস্টে ১২টিতে হার আর একটিতে ড্র—এমন একতরফা রেকর্ড নিয়ে ২০২৪ সালে পাকিস্তান সফরে যায় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের মাটিতে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ২০ ম্যাচে ২০টিতেই হারের আরেক রেকর্ডও ছিল সঙ্গী।

তারপর যা ঘটল, তা ইতিহাসের অংশ। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্টেই পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে এক ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ২৬ রানে ৫ উইকেট হারানোর পরও জয়লাভ করে তারা।

২০ মাস পর আজকের দিনে আবার টেস্টে মুখোমুখি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। মিরপুর ও সিলেটে দুই টেস্ট খেলবে দুই দল। বাংলাদেশে এ নিয়ে পাকিস্তানের পঞ্চম সিরিজ। সামগ্রিকভাবে দুই দলের অষ্টম টেস্ট সিরিজ। এছাড়া ২০০১ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তারা মুখোমুখি হয়।

মুলতানের সেই ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য ছিল দুঃস্বপ্ন। মুলতানের দুঃস্বপ্ন থেকে রাওয়ালপিন্ডির জয়—বাংলাদেশ-পাকিস্তান টেস্ট লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত গল্প।

২০০১
দুঃস্বপ্নের নাম মুলতান

অভিষেকের পরের বছর টেস্টে প্রথম পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিস ছিলেন পাকিস্তান দলে। দুই ইনিংসেই ৬টি করে উইকেট নিয়ে লেগ স্পিনার দানিশ কানেরিয়া বাংলাদেশকে দুঃস্বপ্ন দেখান। প্রথম ইনিংসে ১৩৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪৮। পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা ওভারপ্রতি ৪.৭৫ রান তুলে ৩ উইকেটে ৫৪৬ রানে ইনিংস ঘোষণা করে। ছয় ব্যাটসম্যানের মধ্যে পাঁচজন সেঞ্চুরি তুলে নেন, যা টেস্টে দ্বিতীয়বার ঘটে। তিন দিনে ইনিংস ও ২৬৪ রানে হারে বাংলাদেশ।

২০০২
ঘরের মাটিতেও দুর্দশা

ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুই টেস্টই তিন দিনে জিতে নেয় পাকিস্তান। দুই ম্যাচেই একবারের বেশি ব্যাট করেনি তারা।

ঢাকায় প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেটে ১৪০ রানের পর বাংলাদেশ অলআউট হয় ১৬০ রানে। শেষ ৭ উইকেটের ৬টি নেয় অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিস। বোলিংয়েও একই রকম। ২২১ রানে ৫ উইকেট নিলেও পাকিস্তানকে অলআউট করতে পারে না বাংলাদেশ। আবদুল রাজ্জাকের ১৩৪ ও রশিদ লতিফের ৯৪ রানে ৯ উইকেটে ৪৯০ রানে ঘোষণা করে পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫২ রান করে বাংলাদেশ, ৭ উইকেট নেয় দানিশ কানেরিয়া।

চট্টগ্রামে দুই ইনিংসে ১৪৮ রান করে অলআউট হয় বাংলাদেশ। মোহাম্মদ ইউসুফের ডাবল সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান ৯ উইকেটে ৪৬৫ রান করে।

২০০৩
এত কাছে তবু এত দূর

পাকিস্তানে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণ সফর। তিন টেস্ট ও পাঁচ ওয়ানডে খেলে আট ম্যাচেই হারে বাংলাদেশ। মুলতানে ২০০১-এর মতো বাজে হার নয়, কাছে গিয়ে জয় না পাওয়ার যন্ত্রণা হয়।

প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ ২৬১ রানের লক্ষ্য দেয়। ১৩২ রানে ৬ উইকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। কিন্তু ইনজামাম-উল-হক ১৩৮ রানে অপরাজিত থেকে ১ উইকেটে জিতিয়ে দেন পাকিস্তান। খালেদ মাহমুদের চোখ মুছতে মুছতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য ম্যাচের প্রতীক।

২০১১
অন্ধকারে সাকিব আলো

নয় বছর পর পাকিস্তান বাংলাদেশে টেস্ট খেলতে আসে। মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে না হারাটাই ‘বড় সাফল্য’। চট্টগ্রামে মোহাম্মদ হাফিজ (১৪৩), ইউনিস খান (২০০*) ও আসাদ শফিক (১০৪)-এর সেঞ্চুরিতে ৫৯৪ রান করে ঘোষণা দেয় পাকিস্তান। বাংলাদেশ দুই ইনিংসে ১৮৪ রান কম করে।

মিরপুরে সাকিব আল হাসান অলরাউন্ডার পারফর্ম করেও শুধু ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পান। বাংলাদেশের ১৪৪ রানের পর পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেন সাকিব। ১০৩ রানের লক্ষ্য ৩ উইকেটে পেরিয়ে যায় পাকিস্তান।

২০১৫
তামিম-ইমরুলের রেকর্ড জুটি

চার বছর পর পাকিস্তান আসে। প্রথমবার ধবলধোলাই হয় না বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের উদ্বোধনী জুটির কৃতিত্ব। প্রথম ইনিংসে ৩৩২ রান করে বাংলাদেশ। মোহাম্মদ হাফিজের ডাবল সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান ৬২৮ রান করে। দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম-ইমরুল ৩১২ রানের জুটি গড়ে, যা টেস্টে সর্বোচ্চ। তামিম ২০৬, ইমরুল ১৫০। পরের টেস্টে ৩২৮ রানে হারে বাংলাদেশ।

২০২০
সব ছাপিয়ে করোনা

জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তিন টি-টুয়েন্টি ও এক টেস্ট, এপ্রিলে ওয়ানডে ও দ্বিতীয় টেস্ট—সফরটা করোনায় বিভক্ত হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে ইনিংস ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। নাসিম শাহ হ্যাটট্রিক করেন দ্বিতীয় ইনিংসে।

২০২১
আবারও ধবলধোলাই

চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে পেসারদের কাছে ৮ উইকেটে হারে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় টেস্টে বৃষ্টিতে তৃতীয় দিনে ৪ উইকেটে ৩০০ রান করে পাকিস্তান ইনিংস ছাড়ে এবং জিতে যায়। প্রথম ইনিংসে ৮৭ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। সাজিদ খান প্রথমে ৪২ রানে ৮ উইকেট, দ্বিতীয়ে ৪ উইকেট নেন। বাংলাদেশ ২০৫ রানে অলআউট।

২০২৪
অবিশ্বাস্য বাংলাদেশ, পাকিস্তান ধবলধোলাই

রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টে পাকিস্তান ৪৪৮ রানে ঘোষণা করে। মুশফিকুর রহিমের ১৯১ রানে বাংলাদেশ ৫৬৫ রান করে। সাকিব-মিরাজ ১৪৬ রানে পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেয়। ৩০ রানের লক্ষ্য উইকেট না হারিয়ে পেরিয়ে জয়।

দ্বিতীয় টেস্টে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। লিটন দাস (১৩৮) ও মেহেদী হাসান মিরাজের (৭৮) ১৬৫ রানের জুটিতে ২৬২ রান। টেস্টে ৫০-এর নিচে ষষ্ঠ উইকেটের পর সপ্তমে সবচেয়ে বড় জুটি।

হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানা ৯ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে ১৭২ রানে অলআউট করে। ১৮৫ রানের লক্ষ্য ৪ উইকেটে পেরিয়ে জয়লাভ করে বাংলাদেশ।