হোমারের মহাকাব্যে ওডিসিউসের ট্রয় থেকে ইথাকা ফেরার দীর্ঘ অভিযানের কথা আমরা পড়েছি। পথে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেন, বিশেষ করে জলপরী ক্যালিপসোর দ্বীপে অনেক সময় কাটান। যদি তার স্ত্রী পেনেলোপি সেই সময় নিয়ে প্রশ্ন করতেন, তাহলে ওডিসিউস হয়তো বলতেন, ‘ও কিছু নয়। আসলে ওটা ছিল শূন্যের চেয়েও কম। ক্যালিপসোর কাছে আমি ছিলাম মাইনাস পাঁচ বছর! তা না হলে ১০ বছরের মধ্যে আমি কীভাবে বাড়ি ফিরতাম? বিশ্বাস না হলে তাকেই জিজ্ঞেস করো।’
কোয়ান্টাম কণাগুলো প্রায় ওডিসিউসের মতোই চতুর। সম্প্রতি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। কোয়ান্টাম কণার আগমনের সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা অন্য কণাগুলোর সঙ্গে এমন এক সময় অতিবাহিত করেছে, যা গাণিতিকভাবে ঋণাত্মক বা নেগেটিভ।
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ওয়াইজম্যান বলেন, ‘আমাদের পরীক্ষায় আমরা ব্যবহার করেছি ফোটন বা আলোর কোয়ান্টাম কণা। রুবিডিয়াম পরমাণুর একটি মেঘের মধ্য দিয়ে সোজা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এই ফোটনগুলোকে একটি প্রতিকূল যাত্রা করতে হয়। এই পরমাণুগুলোর সঙ্গে ফোটনের একটি রেজোনেন্স বা অনুনাদ তৈরি হয়। এর অর্থ হলো, ফোটনের শক্তি সাময়িকভাবে পরমাণুর মধ্যে স্থানান্তরিত হতে পারে। একে পারমাণবিক উত্তেজনা বলা যায়। এর ফলে ফোটনটি মুক্তি পাওয়ার আগে পরমাণুর মেঘের ভেতর কিছু সময় বসবাস বা অবস্থান করার সুযোগ পায়। এই অনুনাদ কার্যকর হওয়ার জন্য ফোটনের একটি সুনির্দিষ্ট শক্তি থাকা প্রয়োজন, যা রুবিডিয়াম পরমাণুকে উত্তেজিত অবস্থায় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু হাইজেনবার্গের বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ী, যদি ফোটনের শক্তি সুনির্দিষ্ট হয়, তবে তার সময় হবে অনিশ্চিত। অর্থাৎ ফোটনটি যে আলোক স্পন্দনের অংশ, তার স্থায়িত্ব হবে দীর্ঘ। এর মানে হলো, ফোটনটি ঠিক কখন মেঘে প্রবেশ করছে তা আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারি না, তবে গড়ে কখন প্রবেশ করছে তা জানতে পারি।’
যদি এমন ফোটন রুবিডিয়াম পরমাণুর মেঘে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে সাধারণত এর শক্তি পরমাণুতে স্থানান্তরিত হয় এবং পরে যেকোনো দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একে বিক্ষিপ্ত হওয়া বলে। এমন ক্ষেত্রে ফোটন তার গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু কোনো ফোটন যদি বাধা না পেয়ে সরাসরি মেঘের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসে, তাহলে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ফোটনটি গড়ে কখন মেঘে প্রবেশ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে অপর প্রান্তে কখন পৌঁছাবে তার সময় হিসাব করা যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফোটনটি প্রত্যাশিত সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে যাচ্ছে। আসলে এটি এত আগে পৌঁছায় যে মনে হয় এটি মেঘের ভেতরে ঋণাত্মক সময় বা নেগেটিভ টাইম ব্যয় করেছে, অর্থাৎ প্রবেশের আগেই যেন বেরিয়ে এসেছে।
এই প্রভাবটি কয়েক দশক ধরেই পরিচিত এবং ১৯৯৩ সালের একটি পরীক্ষায় এটি প্রথম লক্ষ করা যায়। তবে বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এই ঋণাত্মক সময়কে গুরুত্ব দেননি। তাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন, দীর্ঘ আলোক স্পন্দনের শুধু সামনের অংশটি মেঘ ভেদ করে বেরিয়ে আসে এবং বাকি অংশ বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ফলে ফোটনটি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত পৌঁছায় বলে মনে হয়। এটি সময়ের কোনো রহস্য নয়, যান্ত্রিক বিভ্রম হতে পারে।
কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এফ্রাইম স্টেইনবার্গ ঋণাত্মক সময়কে বিভ্রম বলে মানতে রাজি নন। তাই তিনি ফোটন কতক্ষণ ছিল তার উত্তর খুঁজে বেড়ান। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্সে একটি বড় সমস্যা আছে। কোনো সিস্টেমকে পরিমাপ করলেই তা বিঘ্নিত হয়। যদি প্রতিটি মুহূর্তে নিখুঁতভাবে মাপা হয় ফোটনটি পরমাণুর ভেতর আছে কি না, তাহলে পর্যবেক্ষণের কারণেই পরমাণু ও ফোটনের মিথস্ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। একে কোয়ান্টাম জেনো এফেক্ট বলে।
সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ক্যালিব্রেট করা পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে সিস্টেমটি খুব একটা বিঘ্নিত হয় না। একটি দুর্বল লেজার রশ্মি পরমাণুর মেঘের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। সেই রশ্মির দশা বা ফেজের সামান্য পরিবর্তন পরিমাপ করে দেখা হয় পরমাণুগুলো উত্তেজিত হয়েছে কি না।
পরীক্ষার প্রতিটি একক প্রচেষ্টা থেকে ফোটনের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়া গেলেও, লক্ষাধিক প্রচেষ্টার গড় করলে নির্ভুল ডুয়েল টাইম বা অবস্থানকাল পাওয়া যায়। বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ওয়াইজম্যান বলেন, ফলাফলটি ছিল বিস্ময়কর! যখন ফোটন মেঘের মধ্য দিয়ে সরাসরি চলে যায়, তখন সেই দুর্বল পরিমাপের মাধ্যমে পাওয়া অবস্থানকাল ঠিক ততটাই ঋণাত্মক হয়, যতটা ফোটনের আগমনের সময় থেকে পাওয়া গিয়েছিল। এর আগে কেউ ভাবেনি যে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতির পরিমাপের ফলাফল এভাবে মিলে যাবে। আমাদের এই পরীক্ষাটি সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তবে এটি প্রমাণ করে, নেগেটিভ ডুয়েল টাইম বা ঋণাত্মক অবস্থানকাল কোনো কৃত্রিম বিভ্রম নয়। এটি শুনতে আপাতবিরোধী মনে হলেও, পরমাণুর মেঘের ওপর এর সরাসরি পরিমাপযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট






