চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের ফিরতি লেগে গতকাল রাতে বায়ার্ন মিউনিখ ও পিএসজি ম্যাচে রেফারির একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক চলছে। তখন ম্যাচে ৩১ মিনিট সময় চলছিল। পিএসজি ১-০ গোলে এগিয়ে। পিএসজির ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া বক্সের ভিতর থেকে বল ক্লিয়ার করতে শট নেন। বলটি লাগে বক্সের মধ্যেই দাঁড়ানো তাঁর সতীর্থ এবং পিএসজির মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেসের হাতে।
বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়রা পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পেদ্রো সিলভা পিনহেইরোকে ঘিরে পেনাল্টির দাবি জানায়। ডাগআউট থেকে বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানিও একই দাবিতে ছুটে আসেন। কিন্তু রেফারি পেনাল্টি দেননি। এমনকি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)ও হস্তক্ষেপ করেনি। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় বায়ার্নের ভক্ত, খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ সবাই এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রেফারির এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
ফিরতি লেগ ১-১ গোলে ড্র হয়। দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫ গোলের জয়ে পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছে। বায়ার্ন সমর্থকরা ভাবছেন, নেভেসের হ্যান্ডবলে পেনাল্টি পেলে এবং গোল হলে স্কোর সমান থাকত এবং ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে রেফারি জোয়াও পেদ্রোর সমালোচনা করছেন। কিন্তু রেফারি কি ভুল করেছেন, নাকি সিদ্ধান্ত সঠিক? হ্যান্ডবলের আইন কী বলে?
বিবিসি স্পোর্টসের ফুটবল প্রতিবেদক ডেল জনসনের মতে, হ্যান্ডবল আইনের একটি অপ্রচলিত নিয়মের কারণে পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, ‘বল যদি নিজের দলের কোনো খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এসে হাতে বা বাহুতে লাগে, তবে তা হ্যান্ডবল হিসেবে গণ্য হবে না (যদি না বলটি সরাসরি প্রতিপক্ষের জালে জড়ায় অথবা ওই খেলোয়াড় তাৎক্ষণিকভাবে গোল করেন; সে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ দল সরাসরি ফ্রি-কিক পাবে)।’
জনসন ব্যাখ্যা করেন, ‘সতীর্থের কাছ থেকে আসা বলটি অপ্রত্যাশিতভাবে আপনার গায়ে লাগলে নিয়মটি কার্যকর হয়। এ ক্ষেত্রে হাত শরীর থেকে দূরে থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী পেনাল্টি দেওয়া উচিত নয়।’ তিনি যোগ করেন, ‘ভিতিনিয়া যখন জোরালো শটে বল ক্লিয়ার করেন, তখন জোয়াও নেভেস কি ভাবতে পেরেছিলেন যে বলটি সরাসরি তাঁর দিকেই আসবে? অবশ্যই, ইচ্ছাকৃতভাবে হ্যান্ডবল করলে নিয়মটি খাটবে না; তবে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পেনাল্টি দেওয়ার কথা নয়।’
ইএসপিএনকে ইংল্যান্ডের সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি ইংল্যান্ডের পেশাদার রেফারিদের প্যানেল ‘সিলেক্ট গ্রুপ’-এর সাবেক সদস্য। প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে এক যুগের বেশি সময় এলিট প্যানেলে রেফারি হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি প্রিমিয়ার লিগের ভিএআর কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন।
ডেভিসের মতে, নেভেসের হাতে বল লাগায় পেনাল্টি না দিয়ে রেফারি জোয়াও পেদ্রো সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সতীর্থের কাছ থেকে আসা বল কোনো খেলোয়াড়ের হাতে বা বাহুতে লাগলে শাস্তি দেওয়া হয় না। তবে দুটি ব্যতিক্রম আছে—প্রথমত, বলটি সরাসরি প্রতিপক্ষের জালে জড়ালে (কিংবা ওই খেলোয়াড় তাৎক্ষণিক গোল করলে প্রতিপক্ষ পরোক্ষ ফ্রি-কিক পাবে); দ্বিতীয়ত, নিজ দলের গোল বাঁচাতে ইচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে বল ঠেকালে পেনাল্টি দেওয়া হবে।
ফুটবলের এই আইন প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে। কিন্তু এর যুক্তি জোরালো। সহজ কথায়, বক্সে হ্যান্ডবলের জন্য শাস্তি দেওয়া হয় কারণ তাতে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় অবৈধ অংশ (হাত) ব্যবহার করে সুবিধা নেয় এবং প্রতিপক্ষের গোলের সুযোগ নষ্ট করে। কিন্তু সতীর্থের কাছ থেকে বল হাতে লাগলে সাধারণত বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায় না, বরং রক্ষণভাগের চাপ বাড়ে। তাই এমন হ্যান্ডবলের শাস্তি যুক্তিযুক্ত নয়।
তবে সতীর্থের বল যেকোনো অবস্থায় হাতে লাগানো যাবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে গোল বা গোলের পথে শট প্রতিহত করলে পেনাল্টি এবং লাল কার্ডও সম্ভব। সতীর্থের বল হাতে লাগিয়ে গোল করলে তাও বাতিল।
সেমিফাইনাল প্রথম লেগে বিতর্কিত হ্যান্ডবলের পেনাল্টি হজম করেছিল বায়ার্ন। ফিরতি লেগে পেনাল্টি না পাওয়ায় কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি বলেছেন, ‘যেহেতু (বলটা) তার সতীর্থের কাছ থেকে এসেছে, তাই পেনাল্টি নয়। তবে (ঘটনার) দুটি দিক বিবেচনা করলে এবং সামান্য কাণ্ডজ্ঞান খাটালেই বোঝা যায় এটি হাস্যকর সিদ্ধান্ত। এখন যা হওয়ার তা-ই হবে, কিন্তু পুরো বিষয়টিই ছিল অযৌক্তিক। এই একটি সিদ্ধান্ত পুরো খেলার ভাগ্য নির্ধারণ করেনি ঠিকই, তবে দিন শেষে ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দিয়েছে ওই এক গোলই।’






