চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত চুনতি গ্রামে ‘চুনতি লাইটহাউস’ গড়ে উঠেছে শুধু একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়, বরং অবহেলিত গ্রামীণ এলাকায় স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক দারুণ উদ্যোগ। দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের অসংখ্য কিশোর-কিশোরীদের জন্য শহরে গিয়ে কম্পিউটার শেখা ছিল বিলাসিতার সমতুল্য। এই প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে প্রযুক্তির চাবি তুলে দিচ্ছে। গ্রামে বসেই বিনা মূল্যে বিশ্বমানের তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ প্রান্তিক তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক। ফলে চুনতির মতো জেলা শহর থেকে দূরবর্তী এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থাভাব ও যাতায়াতের প্রতিকূলতায় আধুনিক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ‘কম্পিউটার শিক্ষা’ থেকে বঞ্চিত হয়। ২০২২ সালে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান সেই বৈষম্য দূর করতে কাজ করে চলেছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণরা কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে গ্রামীণ মেধা যেকোনো চ্যালেঞ্জ জয় করতে পারে।

চুনতি লাইটহাউসের কার্যক্রমের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক এর বহুমাত্রিকতা। একদিকে ১৭টি কম্পিউটারের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং ও হার্ডওয়্যার প্রশিক্ষণ, অন্যদিকে দেড় হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার—সব মিলিয়ে এটি একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। খান ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এমন নিঃস্বার্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা সত্যিই অনুকরণীয়। সুন্দর প্রজন্ম গড়তে সরকারি পদক্ষেপের অপেক্ষা না করে নাগরিক সমাজ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, চুনতি লাইটহাউস তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

তবে এই মহতী উদ্যোগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এর স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। মাসে লক্ষাধিক টাকার পরিচালনা ব্যয় কেবল ব্যক্তি বা ফাউন্ডেশনের অনুদানে মেটানো দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হতে পারে। লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, যেন তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না যায়। সরকারি আইসিটি বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসনের উচিত চুনতি লাইটহাউসকে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এনে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া।

দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে তরুণদের পেশাগত দক্ষতায় গড়ে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি-বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখলেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা এখনো পিছিয়ে। সেক্ষেত্রে চুনতি লাইটহাউসের মতো উদ্যোগগুলোকে রক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ুক, সেটিই কাম্য।