বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে দেশে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের অবসর সময়টি কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, বিশেষ করে বৈষম্যমূলক চর্চা নিরসন এবং ইউরোপের বাজারে পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দরকার।
ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আজ বুধবার ‘বাংলাদেশে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে সার্কুলার রূপান্তরের জন্য সুইচটুসিই পাইলট প্রকল্পের প্রাপ্তি’ শীর্ষক সেমিনারে ইইউ রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএ যৌথভাবে এ সেমিনার আয়োজন করে।
মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইইউর সঙ্গে সমপর্যায়ের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। উত্তরণের সময়সীমা যাই হোক না কেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, সার্কুলার বা চক্রায়ন অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং পরিবেশসংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়নে আগাম পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা যে অনুরোধ পেয়েছি, তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করছি।’
ইইউ রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২২ সালে ইইউর টেকসই ও সার্কুলার টেক্সটাইল কৌশলে ইকো-ডিজাইন, উৎপাদকদের বর্ধিত দায়বদ্ধতা, বাধ্যতামূলক ডিজিটাল পণ্য পাসপোর্ট এবং গ্রিনওয়াশিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নিয়মসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বছরে ৫০ লাখ টনের বেশি টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপন্ন হয়; আর বাংলাদেশে এর পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ টন। বিপুল বর্জ্যের কারণে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতকে সার্কুলার রূপান্তরের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই রূপান্তরে সহায়তা করতে ইইউ বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে চক্রায়ন অর্থনীতির রূপান্তরকে সরকার সমর্থন করে। এই পাইলট প্রকল্পের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা হবে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে দেশকে আরও বিনিয়োগযোগ্য করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, লজিস্টিক খরচ কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব একটি ড্যানিশ কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে সফল আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, ব্যবসা শুরু সহজ করতে ‘রিয়েল টাইম’ ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু করা হচ্ছে, যেখানে সব সেবা এক জায়গায় পাওয়া যাবে। এতে বিনিয়োগকারীদের লাইসেন্স পেতে নানা দপ্তরে ঘোরাঘুরি করতে হবে না। সেমিনারে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ব ফ্যাশন শিল্পে পরিবেশগত সচেতনতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সচেতন।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বস্ত্রশিল্প বিশ্বে অন্যতম দূষণকারী ও সম্পদনির্ভর খাত হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব কমানো এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে এই বর্জ্য ‘ঝুট’ নামে পরিচিত। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে এই বিপুল বর্জ্যকে একটি কার্যকর ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করা জরুরি। সার্কুলার অর্থনীতি এখন আর পছন্দের বিষয় নয়; বরং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য শর্ত।
মাহমুদ হাসান খান আরও বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্জ্য আলাদা বা শ্রেণিবদ্ধ করা হয় না, ফলে উৎপাদনকারীরা তা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া বর্জ্য বিক্রিতে অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (চলতি দায়িত্ব) সচিব মো. আবদুর রহিম খান। অনুষ্ঠানে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।






