মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চার মাস পার হলেও ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীরা এখনো চিহ্নিত না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলেই আমরা মনে করি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই মাসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ২৮ এপ্রিল সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবি জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া এবং উসকানিদাতা অনেককে শনাক্ত করতে পেরেছে। তবে নেপথ্যে কারা জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করা যায়নি।
.২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে ব্যবহার করে মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালায় একদল উগ্রপন্থী। তবে হামলার আগে ও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘিরে যে সংঘবদ্ধ বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও উসকানি চলেছে, তাতে এটা সুস্পষ্ট যে পরিকল্পনা ও সমন্বয় করেই এটি ঘটানো হয়েছে। হামলা ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে শুধু সরাসরি হামলাকারী ও উসকানিদাতা নয়; নেপথ্যে থেকে কারা পরিকল্পনা করেছে, কারা অর্থ দিয়েছে এবং পেছনে কোনো রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না, তদন্তে সেটা বের করা জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সমাজের কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেদের অতিক্ষমতায়িত বলে মনে করতে শুরু করেছিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রতিশ্রুতির ঘাটতিতে মব–সহিংসতার উত্থান ঘটেছিল। ফলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এবং কিছু ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এমন ধারণা জন্মেছিল যে জবাবদিহির বাইরে থেকেই তারা যা খুশি তা-ই করতে পারে।
.আমরা মনে করি, মব–সহিংসতা ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকারের চরম নিষ্ক্রিয়তা, কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্রয় ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার–এর মতো সংবাদমাধ্যম এবং ছায়ানট ও উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনে ভয়াবহ হামলা হতে পেরেছিল।
হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও কণ্ঠরোধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথটাকেই রুদ্ধ করে দেওয়া। ১৮ ডিসেম্বর নজিরবিহীন হামলার পর দেশে ও বিদেশে যে বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া ও অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়, তার প্রেক্ষাপটে হামলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মামলার তদন্ত কার্যক্রম সঠিকভাবে হয়নি।
সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠয় হামলা মামলার তদন্ত নিয়ে প্রকাশিত দুই পর্বের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে উসকানিদাতা ব্যক্তিদের পেছনে একাধিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও উগ্রপন্থী শক্তি এবং অর্থদাতা ও প্রচার সহযোগী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই মামলার তদন্ত হতে হবে যথাযথ এবং তথ্যপ্রমাণ হাজির করার জন্য সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি।
.সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সঠিক তদন্ত না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। ঘটনার নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তারা বর্তমান সরকারের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আমরাও মনে করি, বর্তমান সরকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীন গণমাধ্যমের স্বার্থের এ হামলার পরিকল্পনাকারী, সমন্বয়কারী, উসকানিদাতা, অর্থদাতা ও হামলাকারী সবাইকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার পরও কেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি, তারও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার সঠিক তদন্তে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নির্দেশনা জরুরি।






