২১ এপ্রিল সন্ধ্যা। গুলশানের নিকেতনের একটি অফিস। একটি ঘরে ঢুকতেই ভেসে এল জোর মিউজিকের শব্দ। সেই তালে কোরিওগ্রাফারের সঙ্গে নাচ তুলছিলেন অভিনেত্রী পারসা ইভানা। অনুশীলনের মাঝেই হাত নেড়ে হ্যালো জানিয়ে মহড়ায় মনোযোগ দিলেন। এক পাশে বসে প্রার্থনা ফারদিন দীঘি। তাঁকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। তিনিও নাচের অনুশীলন করতেই এসেছেন। কিন্তু এখনো মহড়ায় অংশ নেননি। নিজেই হাত নাড়িয়ে নাচের ভঙ্গি করছিলেন। এমন সময় ঘরে ঢুকলেন আরেক অভিনেত্রী সুনেরাহ্ বিনতে কামাল।
সুনেরাহ্ সোফায় এসে বসতেই দীঘি বললেন, ‘তুমি অনেক সুন্দর নাচো।’
সঙ্গে সঙ্গে সুনেরাহ্র উত্তর, ‘আরে ধুর, খুব বাজে নাচি আমি। আমাকে কেন যে নাচে ডাকে।’এভাবেই আড্ডা, নাচ, গানে সরব হয়ে থাকে মহড়াকক্ষ।
আজ মেরিল-মুক্তকণ্ঠ পুরস্কারের ২৭তম আয়োজন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বসবে তারার মেলা। বিজয়ী তারকাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে পুরস্কার। ফাঁকে ফাঁকে মঞ্চায়িত হবে আলোচিত তারকাদের নাচ, গানসহ নানা কিছু। গত বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকার তিনটি লোকেশনে দিন–রাত চলছে তারই মহড়া।
এক ফাঁকে দীঘি জানালেন, শিশু শিল্পী থাকার সময় থেকেই মেরিল–মুক্তকণ্ঠের আয়োজন তাঁর ভালো লাগে। বললেন, ‘বেশ ভালো লাগছে। আয়োজনটি আমার কাছে আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক এটি পছন্দ করে, যে কারণে মিস করতে চাই না। সিনেমার শুটিং থেকে ছুটি নিয়ে আসতে হয়েছে।’ এর মধ্যেই মহড়ার জন্য দীঘির ডাক পড়ল।
.চুপচাপ বসে ছিলেন সুনেরাহ্। জানালেন, জ্বর নিয়েই মহড়ায় আসতে হয়েছে। ‘কয়েক দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে নেচেছিলাম। তার পর থেকে সবাই আমার নাচের প্রশংসা করছেন। ভালো নাচ পারি না। এখন জ্বর নিয়েই মহড়ায় এসেছি,’ বললেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিও নাচ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
.বনানীর একটি ভবনে ঢুঁ মেরে দেখা গেল, সেখানেও চলছে আরও কয়েকজন তারকার মহড়া। জিয়াউল রোশান আর তমা মির্জার মধ্যে তর্ক হচ্ছে। নাচ শেষে পানি না কোমল পানীয়—এ নিয়ে তর্ক। পাশে একজন বলে উঠলেন, যে গরম পড়েছে, একটা পেলেই হয়। এরই মাঝে তমা আবার রোশানকে খোঁচা দিয়ে বললেন, মহড়ায় টায়ার্ড হয়ে গেলে অনুষ্ঠানের ১২টা বেজে যাবে। রোশান বললেন, ‘আমি সিনেমার নায়ক, নাচ কোনো বিষয় নাকি। দেখবে একদম ফাটিয়ে দেব।’
.অনুশীলনের ফাঁকে ইরফান সাজ্জাদ বললেন, ‘নাচতে পারি আর না পারি, নাচ খুব এনজয় করি। আই লাভ ইট। নাচতে আমার অনেক ভালো লাগে।’ পাশ থেকে তরুণ অভিনেতা প্রান্তর দস্তিদার বললেন, ‘এবারই প্রথম নাচব, এ জন্য বেশ নার্ভাস আছি। তবে এনজয় করছি।’
একসময় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানে নাচতেন প্রান্তর। অভিনয় শুরুর পর একাধিক প্রস্তাব এলেও মঞ্চে তাঁকে কখনোই নাচতে দেখা যায়নি। ‘আমি এখন বেশির ভাগ সময় নাচের অনুশীলন করছি। এত বড় আয়োজন। কেউ যেন বুঝতে না পারে প্রথম নাচছি। যে কারণে শুটিং থেকে ছুটি নিয়েছি। স্টেপগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছি। বলা যায় নাচের মধ্যেই রয়েছি। নার্ভাসনেস কেটে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে দর্শক একটা অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখবেন।’
.ইরফান সাজ্জাদ যোগ করলেন, ‘এবার যে কোরিওগ্রাফিতে নাচছি, এমনটা আগে কখনোই পাইনি। আমার কাছে দুর্দান্ত লেগেছে। আর আমাদের যে জুটি সেটাও দারুণ সিঙ্ক হয়েছে। কোরিওগ্রাফারসহ সবাই অনেক সহযোগিতা করছেন। এটুকু বলব, দুই মিনিটের পারফরম্যান্সের এ সময়ে দর্শক চোখ ফেরাতে পারবে না।’
রোশান জানালেন, প্রতিটি সিনেমায় ৪–৫টি গানে নাচতে হয়। কিন্তু মেরিল–মুক্তকণ্ঠের আয়োজনটি তাঁর কাছে সব সময়ই বিশেষ। কারণ, ‘এখানে আলাদা একটা পরিবেশ, সবাই দারুণ সহযোগিতা করেন। কস্টিউমটা বিশেষ থাকে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজটি করা যায়। বড় কথা শীর্ষ এই আয়োজনে কাজের বৈচিত্র্য থাকে।’
বিশেষ একটি পরিবেশনায় থাকছেন চিত্রনায়িকা তমা মির্জা। তিনি বলেন, ‘অনেক ভালো লাগছে। নিয়মিত মহড়া করেছি। মনে হচ্ছে দর্শকেরা অনেক পছন্দ করবেন।’ তমা মির্জা জানান, সব সময় মেরিল–মুক্তকণ্ঠ পুরস্কার তাঁর জন্য বিশেষ। এখানে পারফর্ম করাটা উপভোগ করেন তিনি। তমা বলেন, ‘এ অনুষ্ঠানটিকে নিজের মনে হয়। প্রতিবারই অনুষ্ঠান ঘিরে একটা পরিকল্পনা থাকে। দর্শকসারিতে তো পুরো ইন্ডাস্ট্রি থাকে, তাই এখানে নাচাটা অবশ্যই সম্মানের।’
.আড্ডায় পরে যুক্ত হন লুইপা। তমা মির্জার সঙ্গে তাঁর জামার রং মিলে যাওয়ায় রোশান বলেন, ‘দেখেছেন, এখানেও ম্যাচিং করে এসেছে।’ হেসে ওঠেন সবাই। মেরিল প্রথম–আলোর আয়োজনে লুইপাকেও নাচতে দেখা যাবে। তিনি জানালেন, শৈশব থেকেই নাচ তাঁর অনেক পছন্দ। কিন্তু গান নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার পর সেই অর্থে আর নাচার সুযোগ থাকে না। ‘এখন সময়ের সঙ্গে সব জায়গাতেই পরিবর্তন আসছে। স্টেজে গাইতে গেলেও কিছুটা নাচতে হয়। গানের মিউজিক ভিডিও করতে গেলেও নাচতে হয়। কিন্তু মেরিল–মুক্তকণ্ঠের স্টেজে এবার ভিন্ন পরিবেশনায় থাকছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি পরিবেশনাটি উপভোগ করছি। কিছুটা ভয় কাজ করছে, এত বড় মঞ্চ! তবে নাচ যেহেতু কিছুটা জানি, শঙ্কা কেটে যাবে। নায়ক-নায়িকাদের দেখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেছি।’
নিকেতনের আরেক স্টুডিওতে চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে পাওয়া গেল। অনুশীলনের বিরতিতে ফোনে কস্টিউমের ছবি দেখছিলেন। রং নিয়ে কিছুটা দ্বিধা কাজ করছে। বললেন, ‘কস্টিউম তো চূড়ান্ত করেছি, কিন্তু এখন যেন মনে হয় ঠিক আছে তো, নাকি আগে যেটা দেখেছিলাম সেটাই মানাত। এমন আমার সব সময় হয় (হাসি)। দর্শকেরা পছন্দ করলেই হলো।’ কথা শেষে আবার নাচের মহড়ায় যাচ্ছিলেন, থেমে বললেন, ‘দর্শক নয় তো, এখানে সব সমালোচক (হাসি)। একদম ভুলের সুযোগ নেই। সব শতভাগ হতে হবে।’
.‘মনোনয়ন পাওয়াটাই আমার কাছে বিশাল স্বীকৃতি’.পাশের স্টুডিওতে সেদিনও চলছে সুনেরাহ্ বিনতে কামাল, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, মন্দিরা চক্রবর্তী আর পারসা ইভানার মহড়া। রিহার্সাল শেষে চারজন ফ্লোরে বসে পড়েন। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস আলাপ। শুধুই কি আলাপ, নাকি অনুষ্ঠান নিয়ে গোপন কোনো পরিকল্পনা! কান পাতার চেষ্টা করতেই দীঘি বলেন, ‘লাভ নেই, অনুষ্ঠানে কী হবে আগে বলা যাবে না।’ ‘অনুষ্ঠানের আগে আমাদের চারজনের বাইরে এ কথা বাইরে যাওয়া কর্তৃপক্ষের নিষেধ,’ হেসে বলে ওঠেন পারসা।
সুনেরাহ্ জানান, অন্যদের মতো এত ভালো নাচতে পারেন না তিনি। তবে সবার সঙ্গে রিহার্সাল করে আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। বলেন, ‘কদিন ধরেই অসুস্থ। জ্বর ছাড়ছেই না। কিন্তু রিহার্সাল তো মিস দেওয়া যাবে না। অনুষ্ঠানের দিন কী হবে জানি না, এখন মনে হচ্ছে উতরে যাচ্ছি। কোরিওগ্রাফার থেকে টিমের সবাই বেশ সহযোগিতা করছেন। নিজেও বিষয়গুলো ধরতে পেরেছি। আগে কিছুটা ভয় কাজ করলেও এখন উপভোগ করছি।’
আজ মেরিল-মুক্তকণ্ঠ পুরস্কার অনুষ্ঠানে রয়েছে আরও অনেক তারকার অনেক চমক।