একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিং—এমন পরিস্থিতি কুমিল্লার মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দিনে ও রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। বিশেষ করে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং চলতি বোরো মৌসুমে সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে শহরের তুলনায় বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রাহকেরা। জেলার কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন মানুষ।
কুমিল্লা নগরসহ জেলার কয়েকটি উপজেলার সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। বাকি ১৭টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের চারটি সমিতির মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কোথাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের তথ্যে, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ৪০ পর্যন্ত ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
.কুমিল্লা শহরতলির দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ। রোববার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে শারমিন আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে আজ রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৭ বার লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর রাত ২টার দিকে বিদ্যুৎ আসে। বাকি ৬ বার ১০ মিনিট থেকে ৩৫ মিনিট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল। এখনো বিদ্যুৎ নেই; পৌনে ১২টার দিকে গেছে। বর্তমানে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময়ের এই লোডশেডিংয়ে বাচ্চাকে নিয়ে অনেক কষ্ট হচ্ছে। দিনে যা-তা, রাতে বেশি কষ্ট হয়।
জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা অহিদুর রহমান মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪–এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং থাকে মনোহরগঞ্জের দক্ষিণ এলাকায়। আমরা গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেয়ে থাকি। বাকি ৮-১০ ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং থাকে। বিদ্যুৎ নিয়ে এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেক কষ্টে আছি।’
.চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-০১) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কুমিল্লা শহরের সঙ্গে সারা দেশের তথ্য ভিন্ন। কারণ, কুমিল্লায় বিদ্যুৎ আসে ভারতের ত্রিপুরা গ্রিড থেকে। এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় না; এই বিদ্যুৎ জাঙ্গালিয়ায় যুক্ত হয়ে সরাসরি কুমিল্লা শহরে সরবরাহ হচ্ছে। যার কারণে সারা দেশের তুলনায় কুমিল্লা শহরে লোডশেডিং অনেক কম। পুরো শহরে ১১০ মেগাওয়াট চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ৮০ মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ পাচ্ছেন।
মো. শহীদুল ইসলাম আরও জানান, কুমিল্লা জোনের বিতরণ বিভাগ থেকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী-এই ৬ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এখানে বিদ্যুতের গড়ে চাহিদা রয়েছে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ থেকে জেলার চান্দিনা, দেবীদ্বার, মুরাদনগর ও বরুড়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। এই সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. রাশেদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই চার উপজেলায় গ্রাহকের সংখ্যা ৬ লাখের বেশি। দিনে চাহিদা ১০০ মেগাওয়াটের বেশি আর রাতে ১৬৫ মেগাওয়াট। কিন্তু প্রতিদিনই গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি লোডশেডিং থাকছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং রাখতে হচ্ছে।
.কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ থেকে জেলার আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, লালমাই ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়ে থাকে। এই সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁদের দিনে চাহিদা থাকে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট; এর বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১২৫ মেগাওয়াট। আর রাতে চাহিদা থাকে প্রায় ১৬০ মেগাওয়াট; এর বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৩৫ মেগাওয়াট। ভারতের ত্রিপুরা থেকে সরাসরি আসা বিদ্যুৎ পাওয়ায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম বলে জানান তিনি।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ থেকে জেলার দাউদকান্দি, হোমনা, মেঘনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার একটি অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মুজিবুল হক বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদা রয়েছে। রোববার সরবরাহ করতে পারছেন ১১২ মেগাওয়াট। ঘাটতি রয়েছে ৪৩ দশমিক ৪৮ মেগাওয়াট। বর্তমানে গড়ে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪–এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. শহীদ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জেলার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলায় এই সমিতি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে গড়ে ৮০ মেগাওয়াট চাহিদা রয়েছে, কিন্তু পাচ্ছেন ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। প্রায় দিনই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
.সেচ ও উৎপাদন ব্যাহত
কুমিল্লার প্রতিটি উপজেলায় ফসলের মাঠে এখন বোরো ধান। এই সময়ে বিদ্যুতের সংকট কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ সেচপাম্প দিন ও রাতের বড় একটা সময় বন্ধ থাকছে।
জেলার দেবীদ্বারের জাফরগঞ্জ এলাকার কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, ধানের শিষ বের হয়েছে কয়েক দিন আগে; এই সময়ে জমিতে নিয়মিত পানি প্রয়োজন, কিন্তু বিদ্যুৎ যায় তো আর আসে না। অনেকের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, এতে ফলন অনেক কমে যাওয়ার ভয় করছেন। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ভান্তি এলাকায় বিদ্যুতে চালিত একটি সেচপাম্পের মালিক জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা আমরা বিদ্যুৎ পাই না। আমাদের এই পাম্প দিয়ে গোমতী নদী থেকে মানুষের জমিতে সেচ দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো মানুষের বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছি না। প্রতিদিনই মানুষের কথা শুনতে হচ্ছে। কী যে দুর্ভোগে আছি, বলে বুঝাতে পারব না।’
.চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে কুমিল্লা নগরের আশোকতলা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্পনগরীতে উৎপাদক ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন কারখানার মালিক ও শ্রমিকেরা। একটি খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক শাহ আলম মুক্তকণ্ঠকে জানায়, ‘প্রায় ২০ দিন ধইরা খুব কষ্টে আছি। আমরার কারখানায় বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বানাই। বেশির ভাগ কাজ করতেই কারেন্ট লাগে। কামের সময় বারবার লোডশেডিং হওয়ায় মালামাল বানাইতে বেশি সময় লাগতাছে। ৮ ঘণ্টার কাম এহন ১১ থাইক্যা ১২ ঘণ্টায় করোন লাগে।’
বিসিকের একটি কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরও চালাতে পারি না তেলের সংকটের কারণে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চললে অনেক লোকসান গুনতে হবে।’
বিসিকের মতো কুমিল্লা ইপিজেডসহ জেলার প্রতিটি এলাকায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কুমিল্লা বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁদের ১৪১টি শিল্পকারখানার প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে প্রায় ১৫ দিন ধরে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।






