হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় উঠেই সিঁড়ির বাঁ পাশের দুটি কক্ষ নিয়ে ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড-২’। সেখানে শিশুদের জন্য ৩২টি শয্যা রয়েছে। তবে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় শয্যা পূরণ হয়ে গেছে অনেক আগেই। শয্যার পর কক্ষের মেঝে, এরপর করিডরের জায়গাও শেষ হয়ে গেলে শিশুদের ঠাঁই হয়েছে সিঁড়ির পাশের খালি জায়গায়। মেঝে, করিডর ছাপিয়ে সিঁড়ির সামনেও গড়াগড়ি করছে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুরা।
শয্যাসংকটে এমন দুর্ভোগের মধ্যেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ ভর্তি হওয়া শিশুদের চিকিৎসা চলছে। এতে কষ্টের শেষ নেই সেবা নিতে আসা মানুষের। এমন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা চলায় হামের সংক্রমণ আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১৮ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে এখানে শিশুদের ভর্তি করা শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৩১২টি শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয় ৩৬ শিশু। তাদের মধ্যে ৪ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে ২১৩ শিশু বাড়ি ফিরে গেছে। অভিভাবকেরা এখান থেকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন চারজনকে। আর বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে প্রথম একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ৯৪টি শিশু চিকিৎসাধীন।
.উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো সেখানে কোনো রোগীকে ভর্তি না করে সরাসরি কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হাসপাতালের উপপরিচালক মো. শাহজাহান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যেসব রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চাইলে সেখানে ওই সব রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারে; কিন্তু সেটি না করে সব কুমিল্লায় পাঠানো হচ্ছে।
মো. শাহজাহান বলেন, ‘আমাদের শয্যার সংকট দীর্ঘদিনের। বর্তমান পরিস্থিতিতে এত শয্যা আমরা কোথা থেকে দেব। এরপরও অন্যান্য দিক ম্যানেজ করে দুটি আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু রোগীদের চাপ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলায় মেঝে, করিডর, এমনকি সিঁড়ি ও লিফটের সামনেও সেবা দিতে হচ্ছে।’
বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই হামের জন্য একটি করে আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুত রয়েছে। এগুলোয় দু–একজন করে ভর্তি আছে। যেসব শিশুর উপজেলায় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, তাদের সেখানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেক সময় হামের কথা শুনলে শিশুদের পরিবারও উপজেলায় রাখতে চায় না, ভালো চিকিৎসার জন্য তারা কুমিল্লা মেডিকেলে নিয়ে আসে।
.বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখো গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড-২-এর কক্ষগুলোয় গাদাগাদি করে চিকিৎসাসেবা চলছে। সেখানে শয্যার বাইরে মেঝে ও করিডরে চাটাই বিছিয়ে শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। জায়গা না হওয়ায় ওয়ার্ডের সামনে সিঁড়ি–সংলগ্ন শিশুদের রাখা হয়েছে। সেখানে অন্তত ২০ শিশুর চিকিৎসা চলছে। প্রচণ্ড গরমে শিশুদের হাঁসফাঁস অবস্থা। অভিভাবকেরা শিশুদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড-২-এ ৩২ শয্যার বিপরীতে অন্তত ৭৫ শিশুকে ভর্তি দেওয়া হয়েছে।
.একই অবস্থা হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড-১-এর। হাসপাতালের মূল ভবনের নিচতলার ২ নম্বর ওয়ার্ড বা মানসিক চিকিৎসা ওয়ার্ডটি বর্তমানে ব্যবহার করছে শিশু বিভাগ। এই বিভাগের ভেতরের একটি কক্ষকে আইসোলেশন ওয়ার্ড-১ করা হয়েছে। সেখানে ১০টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি আছে অন্তত ২০ জন।
.ওয়ার্ড-১–এর একটি শয্যায় জেলার দেবীদ্বারের জয়পুর গ্রামের চার মাস বয়সী যমজ শিশু আইয়ুব ও এয়াকুবের চিকিৎসা চলছে। শিশুদের বাবা মোহাম্মদ ইব্রাহিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দুই দিন আগে হামের লক্ষণ দেখে দুই শিশুকে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক হামের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা মেডিকেলে নিয়ে আসতে বলেন। এরপর তিনি এখানে নিয়ে এসেছেন এবং অনেক কষ্টে একটি শয্যা পেয়েছেন। কিন্তু এখানে চিকিৎসা পেতে চরম কষ্ট হচ্ছে। এরপরও ভালো চিকিৎসক থাকায় কষ্ট করে পড়ে আছেন।
আরও কয়েকজন শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ড-১-এ থাকা বেশির ভাগ রোগীর বাড়িই দেবীদ্বারে। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো শিশুকে হামের উপসর্গ নিয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এক বছর বয়সী শিশু হুমায়রা আক্তারকে নিয়ে এসেছেন দেবীদ্বারের বাসিন্দা শিউলি আক্তার। তিনি বলেন, ‘জ্বর আর শরীরে র্যাশ দেখে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম। পরে সেখানে বলল, কুমিল্লায় নিয়ে যান। এভাবে কুমিল্লায় নিয়ে আসা। এখন মেয়ে কিছুটা ভালো আছে। কিছুটা কষ্ট হলেও এখানে চিকিৎসা ভালো।’
একই উপজেলা থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তারকে নিয়ে এসেছেন তার চাচি নুরজাহান বেগম। তিনি বলেন, মেয়েটিকে হামেরা টিকা দেওয়া হয়নি ছোটবেলায়। কয়েক দিন ধরে জ্বর, কাশি, সর্দি। তিন দিন আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক কুমিল্লায় পাঠান। এরপর এখানে নিয়ে এসেছেন। শয্যা পাননি, যার কারণে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গরমের মধ্যে একটি কক্ষে এতগুলো মানুষের চিকিৎসা অনেক কষ্টের। রোগী ২০ জন হলে মা–বাবাসহ স্বজনেরা আছেন ৩০ থেকে ৪০ জন। সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।
.
গত ১৮ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মিয়া মনজুর আহমেদ। এতে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ শিশুই হামের কোনো টিকা নেয়নি।
মিয়া মনজুর আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ১৮ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২২৭ জন শিশু ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে ১৭২ জন (৭৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ) কোনো প্রকার হামের টিকা নেয়নি। তাদের মধ্যে ৪ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু রয়েছে। শিশুরা সাধারণত ৯ মাস ও ১৫ মাসে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা পেয়ে থাকে। বাকি শিশুদের মধ্যে ২ ডোজ টিকা নিয়েছে ১৯ জন ও ১ ডোজ নিয়েছে ২১ জন। অপর শিশুদের টিকা নেওয়ার সময় এখনো হয়নি।
যারা টিকা নিয়েছে, সেসব শিশুর আক্রান্তের হার কম জানিয়ে মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ১৮ মার্চ প্রথমে একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়। এর পর থেকে প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তখন আরেকটি ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক চেষ্টার পর বর্তমানে ৪২টি শয্যার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। কিন্তু গড়ে প্রতিদিন ১০০ শিশু ভর্তি থাকছে। এখানে পর্যাপ্তসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন শিশুদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু এত বেশি শিশুর শয্যা কীভাবে দেবেন?
.কুমিল্লা মেডিকেলে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রথম মৃত্যু





