২০১৯ সালে ইস্টম্যান কোডাকের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জিম কন্টিনেনজার কাছে এক অপ্রত্যাশিত ফোন আসে। হলিউডের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান তাঁকে সতর্ক করে বলেন, কোম্পানিটি বড় ভুল করতে যাচ্ছে।
তখন ফটোগ্রাফি প্রযুক্তি কোম্পানি কোডাক তাদের অ্যাসিটেট কারখানা বন্ধ করার প্রক্রিয়ায় ছিল। এই কারখানায় ফিল্ম তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদিত হয়। ‘ইনসেপশন’ ও ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো সিনেমার পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান কন্টিনেনজাকে অনুরোধ করেন, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে।
কন্টিনেনজা পরে সিএনবিসিকে বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, “এটা বন্ধ করবেন না, দয়া করে আরেকবার ভেবে দেখুন।” আমি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি। তিনি ঠিকই ছিলেন।’ কন্টিনেনজা আরও বলেন, ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মে কাজ করা একজন পরিচালক হিসেবে নোলানের উদ্বেগ তাঁকে ভাবায়: ‘বিশ্বের সেরা পরিচালকদের একজন কেন এমন কথা বলবেন?’
নিজেকে ‘টার্নঅ্যারাউন্ড স্পেশালিস্ট’ বলে পরিচয় দেন কন্টিনেনজা। তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, কোডাকের ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে ফিল্ম। কোম্পানিটিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে এটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রায় সাত বছর পর ২০২৬ সালের একাধিক অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র যেমন ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ও ‘সিনার্স’ কোডাকের ফিল্মে শুট করা হয়। হলিউডে ফিল্মের প্রতি নস্টালজিয়া এবং তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের সমন্বয়ে ফিল্মের চাহিদা আবার বেড়েছে।
তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। ২০১২ সালে কোডাক দেউলিয়া সুরক্ষা আইনের আশ্রয় নেয় এবং এক বছর পর ছোট আকারে ফিরে আসে। গত বছর কোম্পানিটি সতর্ক করে বলেছিল, তাদের আর্থিক অবস্থায় ‘চলমান প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ’ রয়েছে।
সেই সময় দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোডাকের মোট মুনাফা ১২ শতাংশ কমে যায় এবং কয়েক মিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপ ছিল। কন্টিনেনজার মতে, এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের পথে একটি ধাপ মাত্র।
সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। গত মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চতুর্থ প্রান্তিকে মোট মুনাফা হয়েছে ৬৭ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার, আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বা ৪ কোটি ডলার সুদ ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে।
কন্টিনেনজা বলেন, এটি ২০১৯ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল। এটিকে তিনি করপোরেট জীবনের শেষ পুনরুদ্ধার মিশন বলে বেছে নেন। তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার—পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা। আমরা এই কোম্পানিকে ঠিক পথে রাখব; স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাব এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত গড়ে তুলব।’
ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্থানে কোডাক হিমশিম খেয়েছে। ডিজিটাল ফটোগ্রাফিতে বিপ্লব ঘটলেও সময়মতো আর্থিক উন্নয়ন করতে না পেরে ২০১২ সালে দেউলিয়া সুরক্ষা নেয়। পরে বাণিজ্যিক প্রিন্টিংকে প্রধান ব্যবসা করে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগ কোডাকের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
২০১৪ সালে শেয়ারের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও কমে এবং ২০২০ সালের মার্চে মহামারির শুরুতে ১ দশমিক ৫৫ ডলারে নেমে আসে।
গত বছরের আগস্টে কোডাক জানায়, তাদের কাছে ছিল ১৫৫ মিলিয়ন বা ১৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার নগদ এবং ৬০০ মিলিয়ন বা ৬০ কোটি ডলারের ঋণ। ১২ মাসের মধ্যে পরিশোধযোগ্য ঋণের জন্য তারল্যের অভাবে সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। ওয়াল স্ট্রিট এই খবর ভালো নেয়নি; শেয়ারের দাম সাত ডলার থেকে পাঁচ ডলারের কিছু ওপরে নেমে আসে।
কন্টিনেনজা বলেন, এটি হিসাববিজ্ঞানের ‘সময়জনিত’ বিষয় ছিল, বাস্তবে সংকট ততটা গুরুতর ছিল না।
কোডাকের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বিপুল ঋণ এবং শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ—কন্টিনেনজার মতে। তিনি বলেন, ‘গত সাত বছরে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হয়েছে। ১৩০ বছরের পুরোনো কোম্পানি—ভাবুন, ভেতরে কত জটিলতা!’
দায়িত্ব নেওয়ার পর নেতৃত্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবর্তন করেছেন কন্টিনেনজা। ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ হয়েছে। প্রিন্টিং, উন্নত উপকরণ ও রাসায়নিক খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবসা পুনর্গঠিত হয়েছে।
স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছেন কন্টিনেনজা। পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা আগেই স্বীকার করেছেন।
জেন–জি প্রজন্মের মধ্যে ফিল্মভিত্তিক ছবি-ভিডিওর প্রতি নতুন আগ্রহ জন্মেছে। কন্টিনেনজার ভাষায়, ফিল্মে ধারণ করা ছবি প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের হৃদয় ও আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।
এই প্রবণতা কাজে লাগিয়ে কোডাক ফিল্ম উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একাধিকবার ঋণ পুনঃঅর্থায়নে ব্যালান্স শিট শক্তিশালী হয়েছে। ফল বাজারে ফলছে; গত এক বছরে শেয়ারের দাম প্রায় ১০০ শতাংশ বেড়েছে।






