চৈত্রসংক্রান্তির সন্ধ্যায় ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফোন এল। আমার মতোই তাঁর বয়স ৮৩ প্লাস। সাধারণত সরাসরি দেখা হয় না, তাই মোবাইলই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। কুশল বিনিময়ের পর স্বাস্থ্য নিয়ে দশ মিনিট আলোচনা, তারপর আধঘণ্টা স্মৃতিকথা, এবং শেষে বিশ মিনিট গিন্নি ও সন্তানদের খোঁজখবর—এই ছিল আমাদের রুটিন।
এবার তিনি অন্য বিষয়ে এলেন। একথা-সেকথার পর জিজ্ঞাসা করলেন, পয়লা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠানে যাব কি না, নাকি চারুকলার শোভাযাত্রায় যোগ দেব। আমি কোনোটাতেই যেতে পারব না বলায় তিনি খুশি হলেন। বললেন, ‘তাইলে বাসায় আসো। পয়লা বৈশাখের দাওয়াত নাও। বেশি কিছু না, ডাল–ভাত আর কয়েক রকমের ভর্তা-ভাজি, এইটুকুই থাকবে।’
আমি লোভ সংবরণ করে বললাম, ‘যেতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু উপায় নেই। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সেটাও ভুলে থাকা যেত কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যুদ্ধ-খপ্পরে পড়ায় কোনো কিছুই করার জো নাই।’
বন্ধু বললেন, ‘তোমারে যুদ্ধে পাইল কেমনে? পরিবারের কেউ কি ওই সব দিকে বসবাস করতাছে? তেমন হইলে তো দুশ্চিন্তার বিষয়।’ তাঁর চিন্তা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চলে যাওয়ায় আমি বিস্মিত হইনি। সবার মুখেই এখন এসব কথা।
তাঁকে আসল কথা বললাম, ‘আসলে যুদ্ধে আমাকেও পেয়েছে। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানাদি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছি।’ তারপর ব্যাখ্যা করলাম, কোথাকার যুদ্ধ এসে আমাদের পয়লা বৈশাখের উপর খাঁড়া তুলেছে। ‘মনে কিছু কইরো না। সুযোগ থাকলে অবশ্যই যেতাম। কতকাল পরে তোমার একটা দাওয়াত পাইলাম, আগামী বছর থাকি কি না থাকি কে জানে, তোমার দাওয়াতটা এ বছর মিস করলাম। আসলে আমার গাড়ির তেল নাই। তাই চলাফেরা বন্ধ তেলের আকালে পড়ে। তা ছাড়া তেলের পাম্পে গাড়ির যে লাইন, তা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার দশা।’
বন্ধু যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোকে গালাগাল না দিয়ে নিজ দেশের স্বার্থান্বেষী লোকদের সম্পর্কে বললেন, ‘এসব অসাধু মানুষের কারসাজি। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।’
আমি প্রসঙ্গ পাল্টালাম। বললাম, ‘ওসব কথা থাক। বৈশাখ নিয়ে বরং কথা বলি। এবার বৈশাখ উদ্যাপনে আমার মনে হয় পান্তা-ইলিশ খাওয়া কমবে। কারণ, বাজারে ইলিশ পাওয়ার কথা না, ধরার নিষেধাজ্ঞার জন্যে।’
তিনি বললেন, ‘সেই ক্ষেত্রে চাপিলা দিয়া খাওন লাগবো আরকি। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাইতে হইবো। আর যাতায়াতে “টেসলা” গাড়ি তো আছেই।’ আমি বললাম, ‘টেসলা! সে তো অনেক দামি ব্যাপার। তেলহীন অবস্থায় ওসব এ দেশে চালাবে কে? ওসব আছে নাকি ঢাকায়?’
উনি খুলে বললেন, ‘আরে না। ঢাকায় চার্জার দিয়ে চলা রিকশাগুলোকে সবাই ঠাট্টা করে টেসলা নাম দিয়েছে, শোনোনি?’
আমি আবার চৈত্র-বৈশাখের দিকে প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে বললাম, ‘সেসব কথা থাক। উৎসবগুলো নিয়ে বরং কথা হোক। আমার কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তিই ভালো লাগে। দোকানে দোকানে মিষ্টি খাওয়াখাওয়ির ধুম পড়ে হালখাতার কারণে। বছর শেষের মন খারাপ অবস্থাটি ভুলে থাকতে এই সব খাওয়াদাওয়ার উৎসব চলে বলে আমার ধারণা। আমার মনে আছে, এই দিনটিতে একসময় গ্রামে-গঞ্জে মেলার আয়োজন হতো। সেটিকে জুড়ে দিত পয়লা বৈশাখের সঙ্গে। তারপরও কয়েক দিন ধরে চলত। যত দূর মনে পড়ছে, গেন্ডারিয়া-সূত্রাপুর এলাকার লোহারপুলে মেলা বসত লোকশিল্পের পসরা নিয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থ থেকে দোকানিরা আসত হরেক গ্রামীণ জিনিস নিয়ে। মুড়ি-মুড়কি, কদমা-বাতাসাসহ মিষ্টির দোকান বসত। সেসব এখন আর নেই।’
বন্ধু বললেন, ‘অহন পয়লা বৈশাখ পালনটা শহুরে উৎসব হইয়া গেছে। সারা বছর শহরের সবাই সায়েব-সুবা সাইজা থাকে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ ইত্যাদির গুনতিটা প্র্যাকটিস করে, পয়লা বৈশাখ আসলে এক দিনের বাঙালি সাজে খাওয়াদাওয়ায়, পোশাক-আশাকে।’
কথা শেষের দিকে এসে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানালাম এবং সারা বছর সুখ-শান্তি কামনা করলাম। বন্ধু হেসে বললেন, ‘বৈশাখী ব্যাপারস্যাপারে মঙ্গল শব্দটা উচ্চারণ কইরো না। ওইটাতে অনেকের অ্যালার্জি। এমনিতে মঙ্গলবার, মঙ্গল গ্রহ, এককালের দুর্বিনীত মোঙ্গল জাতি ইত্যাদি কইতে আপত্তি নাই। সেসব উচ্চারণে অভ্যস্ত সবাই। শুধু বৈশাখের পয়লা দিনে ওইটা ব্যবহারে গাঁইগুঁই। তবে এইবার মজা হইলো যে পয়লা বৈশাখের দিনটি পড়ছে মঙ্গলবারেই!’






