২০১৬ সালের এসএ গেমসে সোনা জয়ী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। গত অক্টোবরে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে যাওয়ার আগে দেওয়া নমুনায় তিনি পজিটিভ প্রমাণিত হন, ফলে এই শাস্তি পেতে হয়েছে।

মাবিয়ার এই বহিষ্কার বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতের একটি বড় দুর্বলতা তুলে ধরেছে। খেলাধুলায় ডোপিং নিয়ে সচেতনতা থাকলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সতর্কতা নেই। দেশের অনেক ক্রীড়া ফেডারেশনে ডোপিং–বিরোধী আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। এমনকি জাতীয় পর্যায়ের বড় প্রতিযোগিতাতেও ডোপ টেস্টের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই অসচেতনতার ফলেই মাবিয়ার দুই বছরের বহিষ্কার হয়েছে, যার কারণে ডোপিং নিয়ে দেশের ভয় দিন দিন বাড়ছে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

বিশ্ব ডোপিং–বিরোধী সংস্থা (ওয়াডা)-র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) ডোপিং নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর ১৮.৩ ধারায় উল্লেখ আছে, প্রতিটি ফেডারেশন ডোপিং–বিরোধী নিয়মাবলি তাদের পরিচালনা–সংক্রান্ত বা গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করবে; যা সদস্যদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং ফেডারেশনগুলো অ্যান্টি–ডোপিং নিয়ম প্রয়োগ করতে পারবে।

ওয়াডার ১৮ ধারা অনুসারে, অ্যাথলেট ও কোচিং স্টাফদের জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন ফেডারেশনের বাধ্যবাধকতা। এর লক্ষ্য ডোপিংয়ের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করা, নিষিদ্ধ ওষুধের তালিকা জানানো এবং খেলার স্বচ্ছতা রক্ষা করা। কিন্তু বাংলাদেশের ৫২টি ক্রীড়া ফেডারেশনের অধিকাংশ এ বিষয়ে উদাসীন। কিছু ফেডারেশনের গঠনতন্ত্রে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, অনেকেই এ নিয়ম সম্পর্কে অবগত নয় এবং সচেতনতা কর্মসূচিও হয় না।

অদ্ভুত সব যুক্তি

ফেডারেশনগুলো ডোপিং উদাসীনতার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারে না। কারাতে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতা আয়োজন করেই কূল পাই না, ডোপ টেস্ট কখন করব! এটা নিয়ে আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই।’

বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ কুদ্দুস দায় চাপিয়েছেন বিওএ-র ওপর, ‘কাজটা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের। তাদের ডাক্তার আছে, তারাই সবকিছু তদারক করবে।’ ভারোত্তোলনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘এটা আসলে আমাদের কাজ নয়। গেমসগুলোর আগে অলিম্পিক সেমিনার করে। এ জন্য তারা ফান্ডও পায়।’ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনও একই অজুহাত দেয়। জাতীয় অ্যাথলেটিকসের মতো বড় আসরেও ডোপ টেস্ট হয় না।

অজ্ঞতাই যখন অভিশাপ

দেশের খেলায় শুধু ক্রিকেট ও ফুটবলে ডোপিং সচেতনতা আছে, অন্য ফেডারেশনে নেই। ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ডোপ টেস্টের চর্চা নেই, খেলোয়াড়রা সচেতন নন। ওয়াডার ২১.১.৩ ধারায় বলা আছে, অ্যাথলেটের শরীরে প্রবেশকারী খাবার বা ওষুধের দায় তার নিজের। ‘জানতাম না’ বলে উপায় নেই।

সাধারণ পরিবারের অ্যাথলেটরা ওষুধের নামও ঠিক বোঝে না। জাতীয় সাঁতারু সামিউল ইসলাম বলেছেন, ‘পেটে ব্যথা বা জ্বর হলে হাতের কাছে পাওয়া ওষুধই খেয়ে ফেলি। পরে যদি শুনি, ওই ওষুধের কারণে আমি নিষিদ্ধ, তখন কার কাছে বিচার দেব?’

গত বছরের এপ্রিলে ভুটানে চার জাতি বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতা উৎসব আহমেদ জানিয়েছেন, ডোপিং নিয়ে কেউ সতর্ক করে না। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় আমরা অনুশীলন বা প্রতিযোগিতা নিয়েই ভাবি। ডোপিংয়ের বিষয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। তাই অনেক কিছুই আমাদের অজানা।’

সেরা সাইক্লিস্ট রাকিবুল ইসলাম বলেছেন, জাতীয় প্রতিযোগিতার আগে ডোপিং কর্মশালা ও টেস্ট জরুরি, কারণ খেলোয়াড়রা জানে না ওষুধ নিষিদ্ধ কিনা। জাতীয় দলের সিনিয়র দুই বক্সার জানিয়েছেন, বিদেশ যাওয়ার আগে বিওএর এক সেমিনার ছাড়া সারা বছর আলোচনা হয় না। সাবেক দ্রুততম মানব মোহাম্মদ ইসমাইল বলেছেন, ‘যতটা জানি, প্রতিযোগিতা চলাকালে এমনকি প্রতিযোগিতার বাইরেও ডোপ টেস্ট করার নিয়ম আছে; কিন্তু আমাদের এখানে এসব হয় না।’

ল্যাব–সংকট ও উচ্চমূল্যের অজুহাত

দেশে ওয়াডা–স্বীকৃত ল্যাব নেই। বিওএ-র অধীন ন্যাশনাল অ্যান্টি-ডোপিং অর্গানাইজেশন (নাডা) টেস্ট করে, নমুনা ভারত, ফ্রান্স বা দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠায়। সাইক্লিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আগেই শুধু বিওএর তৎপরতা দেখা যায়। ঘরোয়া পর্যায়ে টেস্ট হয় না; কারণ এটি অনেক ব্যয়বহুল।’ তবে বিওএ সূত্রে জানা গেছে, এক টেস্টের খরচ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।

সমাধানের পথ কী

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ফেডারেশনগুলোকেই খেলোয়াড়দের সচেতন করতে হবে। বিওএর মেডিক্যাল কমিটির এক সদস্য বলেছেন, ‘অসুস্থ হলেও অ্যাথলেটদের সতর্ক হয়ে ওষুধ সেবন করতে হবে। নিষিদ্ধ ওষুধ গ্রহণের পরিণতি সম্পর্কেও তাদের ধারণা থাকা জরুরি।’

বিওএর উপমহাসচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা হয়তো দু–তিন ঘণ্টার সেমিনারে সচেতনতার বীজ বুনে দিতে পারি; কিন্তু সেই গাছ বড় করার দায়িত্ব ফেডারেশনের। ফেডারেশনগুলো যদি তৃণমূল পর্যায়ে নিষিদ্ধ ওষুধের তালিকা পৌঁছে না দেয়, তবে অনেক প্রতিভাই অকালে ঝরে যাবে।’