গ্রীষ্মকালের কালবৈশাখী ঝড়ে আকাশে হঠাৎ কালো মেঘের আবরণ, প্রবল দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমক এবং বজ্রের গর্জনের সমন্বয়েই বজ্রঝড় গড়ে ওঠে। এটি প্রধানত শক্তিশালী কিউমুলোনিমবাস মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়, যা বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে দ্রুত উল্লম্বভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মেঘের অভ্যন্তরে প্রবল উর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ পানিকণা ও বরফকণার সংঘাত ঘটায়, ফলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়।
এই চার্জের ভারসাম্যহীনতা থেকেই বজ্রপাত ঘটে, যা আমরা আলোর ঝলক ও শব্দের মাধ্যমে অনুভব করি। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসে এই বজ্রঝড়ের প্রকোপ সবচেয়ে তীব্র হয়, যা স্বল্পকালীন হলেও অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।
বজ্রঝড়ের অন্যতম উপাদান বজ্রবৃষ্টি। এতে বজ্রপাত, বিদ্যুৎ চমক, দমকা হাওয়া এবং প্রায়ই শিলাবৃষ্টির সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটে। মেঘের মধ্যে জমা আর্দ্রতা দ্রুত ঘন বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়ে নেমে আসে।
এই বৃষ্টি সংক্ষিপ্ত হলেও তীব্রতায় অপ্রতিরোধ্য, যা শহর-গ্রামে জলাবদ্ধতা, ফসলের ক্ষতি ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। বজ্রঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও যুক্ত থাকে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। কিউমুলোনিমবাস মেঘের প্রবল উর্ধ্বমুখী প্রবাহ পানিকণাকে বারবার উপরে নিয়ে গিয়ে বরফে জমিয়ে শিলায় পরিণত করে। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা বেশি, যা কৃষিক্ষেত্রে বিপুল ক্ষতি করে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করে।
বাংলাদেশে বজ্রপাত ক্রমশ একটি গুরুতর জননিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ এতে প্রাণ গুমায়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি। কৃষক ও মৎস্যজীবীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তারা খোলা মাঠ বা জলাভূমিতে কাজ করেন। ভোর বা সন্ধ্যায় কাজে যাওয়া-ফেরার সময়ই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে।
সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা যেমন রাবারের জুতা নিরাপত্তা দেয়, বা বৃষ্টি না হলে বজ্রপাত হবে না বরং এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস ঝুঁকি বাড়ায়। এসব বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যে বজ্রপাত পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে, তবে আরও বিনিয়োগ, সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস প্রদান করে আসছে। ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগের পূর্বাভাসের পাশাপাশি নদীবন্দরগুলোর জন্য নিয়মিত সতর্কতা জারি করা হয়। সাম্প্রতিককালে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে ‘নাউকাস্টিং’ প্রযুক্তির সাহায্যে সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু হয়েছে, যাতে স্যাটেলাইট তথ্য ও গ্লোবাল লাইটনিং ডিটেকশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। তবুও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কারণ সতর্কতা সবার কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না বা অনুসরণ হয় না।
বজ্রপাতের একটি সরল বৈজ্ঞানিক তথ্য হলো আলো আগে দেখা যায়, পরে শব্দ শোনা যায়, কারণ আলোর গতি শব্দের চেয়ে অনেক দ্রুত। আলো দেখার পর শব্দ আসতে যত সেকেন্ড লাগে, তা ৫ দিয়ে ভাগ করে বজ্রপাতের আনুমানিক দূরত্ব জানা যায়। এই সহজ নিয়ম ঝুঁকি মূল্যায়নে সাহায্য করে।
বজ্রপাতে আহতের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অত্যাবশ্যক। প্রায়ই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঘটে, তাই দ্রুত সিপিআর জীবন বাঁচাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ যে, আক্রান্তকে স্পর্শ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ, এই ভুল ধারণা দূর করা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রাণহানি কমাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রনিরোধক যন্ত্র কিছুটা সুরক্ষা দেয়, কিন্তু সর্বত্র কার্যকর নয়। তাই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সতর্কতা প্রচারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বজ্রঝড়ে খোলা জায়গা এড়ানো, গাছতলায় না থাকা, বৈদ্যুতিক যন্ত্র না চালানো এবং শেষ বজ্রধ্বনির পর ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে অবস্থান—এসব মৌলিক সতর্কতা জীবন রক্ষা করতে পারে।
সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা যেমন রাবারের জুতা নিরাপত্তা দেয়, বা বৃষ্টি না হলে বজ্রপাত হবে না বরং এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস ঝুঁকি বাড়ায়। এসব বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যে বজ্রপাত পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে, তবে আরও বিনিয়োগ, সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
অবশেষে বলা যায়, বজ্রপাত প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ফলে মৃত্যু অনিবার্য নয়। সময়োপযোগী সতর্কতা গ্রহণ, সঠিক আচরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি করে শত শত প্রাণ রক্ষা সম্ভব। সচেতনতাই বজ্রপাত থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে পারে।
মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর






