অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর তারা একটি খোলাচিঠিও লিখেছেন।
বিদায়ী কমিশনের সদস্য নূর খান বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের পদত্যাগের কথা বলা হয়নি। একধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যেহেতু তাঁরা আগের অধ্যাদেশের পরই দায়িত্ব পেয়েছিলেন, এখন তা বহাল না হওয়ায় পদত্যাগ করাকেই সমীচীন মনে করেছেন।
এদিকে, কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী বলেছেন, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আগের কমিশন আর নেই। তবে কমিশন সদস্যদের ‘খোলাচিঠি’ তিনি পড়েননি বলে জানান।
গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটি কার্যকর হবে।
বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ আবার চালু করতে বিল পাস করে সংসদ।
চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার একেবারে শেষ দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এ নিয়োগ দেন। কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান, নাবিলা ইদ্রিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের সময়ে গঠিত কমিশন টিকে ছিল নভেম্বর মাস পর্যন্ত। ৭ নভেম্বর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে যান। তাঁরা দিনভর সেখানে থাকেন। সন্ধ্যার দিকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ, সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজা এবং অন্য চার সদস্য বিশ্বজিৎ চন্দ, অধ্যাপক তানিয়া হক, আমিনুল ইসলাম ও কংজুরী চৌধুরী। আরেক সদস্য কাওসার আহমেদ এর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা তখন মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘জোর করেই’ এসব সদস্যকে পদত্যাগ করানো হয়।
এরপর দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগ বন্ধ রাখে তৎকালীন সরকার। এরপর জারি হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদে তা চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। সেই অধ্যাদেশের আলোকেই চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সদ্য বিদায়ী সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
**খোলাচিঠি**
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ওই কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করে যে খোলাচিঠি দিয়েছেন, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে।
‘সদ্য বিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের খোলাচিঠি’ শিরোনামে চিঠিটিতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তিসমূহ’ এবং ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা’—এমন তিন উপশিরোনামে নিজেদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ রহিত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরা হয়।
চিঠির শুরুতে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন, “এখন আমাদের কী হবে?” তাঁদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।
‘আমরা পাঁচজন সদ্য বিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দরুন, ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের দৈনন্দিন প্রতিকূলতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতার সাথে আমরা সুপরিচিত। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’






