ঈদুল ফিতরের তিন সপ্তাহ পর এসেছে বাংলা নববর্ষ। আগামীকাল পয়লা বৈশাখ। প্রতি বছর এ সময় বেশ ভালো হয় বেচাকেনা। তাই ব্যবসায়ীরা এবার বড় ধরনের কেনাবেচার আশা করেছিলেন। বৈশাখের উপলক্ষে নতুন পণ্য ও বিভিন্ন অফার নিয়ে এসেছে কোম্পানিগুলো।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, গত বছরের তুলনায় বেচাকেনা সামান্য বেড়েছে মাত্র, প্রত্যাশিত পরিমাণে নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশের ভোক্তাবাজারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোক্তারা খরচ কমিয়ে নিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সন্ধ্যা সাতটায় দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের কারণে ৫ এপ্রিল থেকে সরকার সন্ধ্যায় সব দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল।
গত বছর পয়লা বৈশাখ ঈদের ১৩ দিন পর ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ঈদ ও পয়লা বৈশাখ একই ছুটিতে কেটেছে। আগের তিন পয়লা বৈশাখ রোজার মধ্যে পড়েছিল। তাই এবার বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছে। ঈদের পর তিন সপ্তাহ সময় পাওয়ায় ভোক্তারাও আলাদা করে প্রস্তুতি রেখেছেন।
দেশে তিনটি উৎসবের সময় পোশাকসহ নানা পণ্যের বেচাকেনা বাড়ে। এগুলো পবিত্র ঈদুল ফিতর, পবিত্র ঈদুল আজহা ও পয়লা বৈশাখ। গত দুই দশকে পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতি প্রসার লাভ করেছে। কারণ এ সময় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। ২০১৬ সাল থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পাচ্ছেন। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশাখের কেনাবেচা বেড়েছে।
রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বৈশাখের কেনাকাটা করার জন্য মানুষের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। বিকেলে পাঁচটার পর থেকে বিক্রয়কেন্দ্রে চাপ বাড়ছে। তবে সন্ধ্যা সাতটায় দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না। তারপরও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈশাখের বেচাকেনাকে খুব ভালো বলতে হবে।”
গত দুই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষবরণ উৎসবে অনেক দোকানে বৈশাখের নতুন সংগ্রহ এসেছে। তবে ক্রেতাদের ভিড় তেমন বেশি নয়। গত শুক্র ও শনিবার ক্রেতাদের চাপ ছিল বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। মাছবাজারে ইলিশের খোঁজ নিয়েছেন অনেকে, তবে দাম বেশি। বৈশাখে হালখাতা ও আপ্যায়নে মিষ্টির চাহিদা বাড়ে। এবারও তাই হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানও বর্ষবরণে প্রস্তুতি নিয়েছে।
বৈশাখী পোশাকের চাহিদা বেশি
পয়লা বৈশাখের অন্যতম অংশ পোশাক। তাই বিভিন্ন বুটিক হাউস ও ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। গ্রাহকেরাও এ সময় পোশাকের দোকানে বেশি ভিড় করে।
গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে দেশী দশে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রেই বৈশাখের আলাদা সংগ্রহ রয়েছে। তবে শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির চাহিদাই বেশি।
বেচাকেনা কেমন জানতে চাইলে সারা লাইফস্টাইলের হেড অব অপারেশন মতিউর রহমান বলেন, “বৈশাখের জন্য পোশাকের নতুন সংগ্রহ আমরা করেছি। ঈদের তিন সপ্তাহ পর পয়লা বৈশাখ হওয়ার কারণে এবার বেচাবিক্রি বেশি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। তবে সন্ধ্যা সাতটায় দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় বৈশাখের বেচাবিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ৯-১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা না রাখার সুযোগ দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।” তিনি বলেন, সন্ধ্যায় বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি ৫০ শতাংশ নেমেছে।
বিক্রেতারা জানান, গ্রীষ্ম শুরু হয়েছে। তাই বেশিরভাগ ক্রেতা গরমে পরা যায় এমন সুতির শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি কিনছেন। বৈশাখী পোশাকগুলো সাধারণত সাদা, লাল, কমলা বা মিশ্র রঙের। পরিবারের সবার জন্য একই স্টাইলের ‘কম্বো’ পোশাকের চাহিদা বেশি। অনেক গ্রাহক দামি পোশাক পছন্দ করেন, তাই হাফ সিল্ক ও মসলিন ধরনের বৈশাখী পোশাক রেখেছে ব্র্যান্ডগুলো। গ্রাহক টানতে অনেক প্রতিষ্ঠান মূল্যছাড় ও উপহার দিচ্ছে। যেমন পোশাকের ব্র্যান্ড টুয়েলভ থেকে কেনাকাটায় চুড়ি, বাঁশি, ডুগডুগির মতো উপহার পাওয়া যায়।
বৈশাখে পোশাকের সঙ্গে জুতা ও গয়নাও কেনেন অনেকে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর নিউমার্কেটে গয়নার দোকানগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, সোনার চড়া দামে সাধারণ ক্রেতাদের ইমিটেশন গয়নার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
রাজধানীর ফার্মগেট থেকে মেয়েকে নিয়ে বসুন্ধরা সিটিতে পোশাক কিনতে এসেছেন শিপ্রা ভৌমিক। তিনি বলেন, “প্রতিবছরই পয়লা বৈশাখে আমাদের বিশেষ আয়োজন থাকে। তবে এবার পারিবারিক কিছু সংকট রয়েছে। তারপরও ন্যূনতম কেনাকাটা করতে এসেছি।”
বিক্রি বেড়েছে মিষ্টির, ইলিশ চড়া
পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী এখনো হালখাতা উৎসব করে বছর শুরু করেন। মিষ্টি-নিমকি দিয়ে ক্রেতা-বন্ধুদের আপ্যায়নের ঐতিহ্য টিকে আছে। নববর্ষের পরদিন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে মিষ্টি খাওয়ার চল হয়েছে। ফলে বৈশাখে মিষ্টির চাহিদা বাড়ে, বিশেষ করে পয়লা বৈশাখে।
প্রাণ গ্রুপের বঙ্গ বেকারসের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাইয়ের সারা দেশে ২৭৫টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তৌহিদুজ্জামান বলেন, এ বছর করপোরেট প্রি–অর্ডার খুব ভালো; গত বছরের চেয়ে তা ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বৈশাখ উপলক্ষে সোমবার পর্যন্ত মিষ্টির অর্ডার নেবে মিঠাই।
পয়লা বৈশাখে সকালে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার চল রয়েছে। বাড়তি চাহিদায় প্রতি বছর বৈশাখে ইলিশের দাম বাড়ে। রাজধানীর বাজারে গতকাল এক কেজি আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়।






