মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় সন্তানের পিতৃপরিচয় আদায়ের জন্য এক নারী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক অপমান, আর্থিক কষ্ট এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘতা সত্ত্বেও তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারপ্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, ডিএনএ পরীক্ষায় সন্তানের বাবার পরিচয় নিশ্চিত হলেও সন্তানটি বাবার অধিকার পাচ্ছে না। এ কারণে তিনি হতাশা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এক যুগ অতিবাহিত হলেও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরিবারটিও অসহায় হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঘটনার পর নারীর পরিবারের অনুরোধে সালিসি বৈঠক ডাকা হয়। সালিশিতে অভিযুক্ত যুবক ওই নারীকে বিয়ে করতে সম্মতি দেন, কিন্তু পরে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
মামলার এজাহার এবং ভুক্তভোগী নারীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আসামি শরিফুল ইসলাম এবং ওই নারীর বাড়ি একই ইউনিয়নে। ২০১২ সালে শরিফুল ওই তরুণীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। কিছুদিন পর তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১২ সালের ১ নভেম্বর রাতে শরিফুল এক প্রতিবেশীর সাহায্যে তাঁর বাড়িতে নিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। অন্তঃসত্ত্বা হলে ভুক্তভোগী শরিফুলকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেন এবং বাবা-মাকে জানান। নারীর পরিবার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে বিচার চান। সালিশিতে শরিফুল রাজি হলেও পরে বিয়ে করেননি। উল্টো ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বায় গর্ভপাতের হুমকি-ধমকি দেন। এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে মানিকগঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের অভিযোগে শরিফুলকে এবং সহযোগিতার অভিযোগে তার এক প্রতিবেশীকে আসামি করে মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী।
ওই নারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার আবেদনসহ মামলা করেন। ডিএনএ পরীক্ষায় শরিফুল তাঁর সন্তানের বাবা নিশ্চিত হলেও মামলার কার্যক্রম বারবার বিলম্বিত হয়। কখনো সাক্ষীর অনুপস্থিতি, কখনো অভিযুক্তের অনুপস্থিতি কিংবা আইনি জটিলতায় মামলাটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
দরিদ্র পরিবারের ভুক্তভোগী নারী প্রায় ছয় বছর ধরে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। তাঁর সন্তানের বয়স এখন ১৩ বছর। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। সামাজিক পরিচয় এবং মানসিক বিকাশে শিশুটি নানা সমস্যায় জড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন শিশুর মা। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের কোনো দোষ নেই। ও কেন বাবার পরিচয় থেকে বঞ্চিত হবে? আমার সন্তানের বাবার অধিকার নিশ্চিত হোক, আমি চাই।’
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মামলা করার পর পুলিশ আসামি শরিফুলকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। এরপর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। এ মামলায় ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর শরিফুলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল করেন হরিরামপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শওকত আলী।
ভুক্তভোগী নারীর বাবা বলেন, ঘটনায় তারা সামাজিক অপমানের শিকার হয়েছেন এবং মামলার কারণে চাপে পড়েছেন। অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। তবু ন্যায়বিচারের আশায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার ভয় জানান তিনি।
আসামি শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা। উচ্চ আদালতে তিনি জামিন পেয়েছেন। আদালতে বিষয়টির মীমাংসা হবে।
আইনজীবীরা বলছেন, এ ধরনের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে নানা কারণে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে দেরি হয়। মামলার জট, আদালতের চাপ এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা বিচারপথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জাতীয় মহিলা সংস্থার মানিকগঞ্জের নির্বাহী কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বজলু বলেন, ভুক্তভোগী নারী তাঁদের কার্যালয়ে আসেন। সংস্থার সহযোগিতায় লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। এক যুগ পেরিয়ে বিচার না পাওয়ায় হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি তিনি। তাঁর একটাই দাবি—সন্তানের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হোক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।
জেলা নারী নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে রায় ঘোষণা হবে। বিচারপ্রার্থী ন্যায়বিচার পাবেন বলে তাঁর বিশ্বাস।






