আমরা এখনো মনে করি এবং বিশ্বাস করি যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সব কর্ম ও অপকর্মের চিহ্ন মুছে যায়, সবাই সবকিছু ভুলে যায়। চিঠি, খাতা, বই মলিন হলে বিক্রি হয়ে যায় এবং মণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে আবার নতুন কাগজ তৈরি হয়; ক্যাসেট প্লেয়ারে রেকর্ড করা থাকলে তা ধ্বংস হয়ে যায়, আমাদের অপরাধ যারা দেখেছে, সেই সাক্ষীদের মৃত্যু হয় এবং পরিশেষে সব তথ্যই হারিয়ে যায়। ইতিহাসের অনেক গোপন ও প্রকাশ্য ঘটনা এভাবেই হারিয়ে গেছে; আমরা জানতেও পারিনি।

কিন্তু আমাদের বর্তমান এই ডিজিটাল পৃথিবীতে কি সত্যিই কিছু হারিয়ে যায়? আগের পৃথিবী আর এখনকার এই পৃথিবী কি একই? আজকের যুগে কোনো তথ্যই হারায় না; সব তথ্য ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। আমাদের ভালো কাজ বা মন্দ কাজ—সবই নথিভুক্ত হয়ে রয়েছে।

জেফরি এপস্টিন ফাইল-সম্পর্কিত খবর পড়তে গিয়ে এসব কথাই মনে হচ্ছে। এই নথিপত্রে আমরা যা দেখছি, তা গোপন অপরাধ, ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তাদের গোপন জীবনের অন্ধকার দিক। এ নিয়ে খবর হয়তো আর দেখব না, কিন্তু এটাকে শুধু কয়েকজন ক্ষমতাধরের কেলেঙ্কারি বলে ভাবলে মূল শিক্ষা হারিয়ে যাবে। এপস্টিন ফাইল আমাদের শেখাচ্ছে, এআই যুগে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধ লুকানো এবং পার পেয়ে যাওয়া কীভাবে আমাদের স্মৃতির প্রকৃতি বদলে দিয়েছে।

এপস্টিনের ঘটনার অপরাধের বিবরণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা তথ্যের স্থায়িত্ব। ই–মেইল, ফ্লাইট লগ, আর্থিক রেকর্ড, ছবি, ফোনের মেটাডেটা, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ—এসব বছরের পর বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশে ছড়িয়ে ছিল, কিন্তু হারায়নি। এগুলো নিঃশব্দে আবির্ভাবের অপেক্ষায় ছিল।

অতীতে তথ্য ছিল খণ্ডিত—মানুষের মনে, বই-ডায়েরিতে, অফিস-আদালতের নথিতে। এখন আমরা সবাই ডেটা হয়ে গেছি। ডেটা কপি হয়, সংরক্ষিত হয়, ব্যাকআপ নেওয়া হয়, ক্লাউডে থাকে, সার্ভার থেকে সার্ভারে চলে। এমনকি মুছে ফেলার চেষ্টাও নতুন তথ্য তৈরি করে। ভুলে যাওয়া বা মুছে ফেলা এখন কঠিন, আসলে অসম্ভব।

এই পরিবর্তন আমাদের নৈতিকতা ও চরিত্র বদলে দিচ্ছে। একসময় মানুষ ভাবত, ‘আমি কি ঠিক করছি?’ এখন প্রশ্ন, ‘এটা কি কোনোদিন আমার বিরুদ্ধে যাবে?’ নৈতিকতা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পরিণত হচ্ছে।

এপস্টিন ফাইলে দেখা গেল, ডিজিটাল যুগে তথ্য কীভাবে বিপজ্জনক হয়। শুধু অস্তিত্বই যথেষ্ট। আজ তুচ্ছ মনে হওয়া তথ্য কাল প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতাবানরা ভেবেছিলেন অর্থ-প্রভাব গোপনীয়তা দেবে, কিন্তু ভুল। ডিজিটাল অবকাঠামো কারও প্রতি অনুগত নয়। সার্ভার মনে রাখে, ডেটাবেজ নষ্ট হয় না, অ্যালগরিদম ক্ষমা করে না।

আমি বলছি না যে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু, তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা প্রস্তুত নই বলেই আমার মনে হয়। প্রযুক্তি চিকিৎসা উন্নত করেছে, শিক্ষা বিস্তৃত করেছে, দুর্নীতি উন্মোচন করেছে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে এবং আরও অনেক উপকার করছে। সমস্যা হচ্ছে আমরা ভাবছি মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে তা জমা হয়ে থাকছে।

এটা শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। আমরা ভাবি আমাদের ডেটার মূল্য নেই, কিন্তু গুরুত্ব পরে নির্ধারিত হয়। পুরোনো মেসেজ, লেনদেন, ছবি বছর পর নতুন অর্থ পাবে।

আজকের নজরদারি অরওয়েলিয়ান—স্মার্টফোন চলাচল রেকর্ড করে, অ্যাপ আচরণ ট্র্যাক করে, সোশ্যাল মিডিয়া পছন্দ সংরক্ষণ করে, ব্যাংক লেনদেন রাখে, ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করে। এটা মানুষ নয়, অবকাঠামো—ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, ম্যাশিন লার্নিং।

এটা আধুনিক অর্থনীতি ও শাসনের কাঠামো। আমরা চাইনি, কিন্তু যারা টাকাপয়সা নিয়ন্ত্রণ করে তারা চেয়েছে। সরকার নিরাপত্তার নামে, করপোরেশন দক্ষতার নামে, প্রযুক্তি কোম্পানি সুবিধার নামে ডেটা সংগ্রহ করে। এতে স্থায়ী নজরদারির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

ডেটা এখন নতুন তেল। কোম্পানিগুলো জানে আমরা কী কিনি, কোথায় যাই, কী পড়ি, কাকে ভালোবাসি, কখন ঘুমাই, কার সঙ্গে ঘুমাই—সব। এটা বিজ্ঞাপনের জন্য নয়, আচরণ পরিবর্তন, নির্বাচন প্রভাবিত, সমাজ পরিচালনার জন্য।

কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা দেখাল রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে ডেটার ব্যবহার। চীনের সামাজিক ক্রেডিট সিস্টেমে বিহেভিয়ার স্কোর। পশ্চিমে ডেটা ব্রোকার পরিচয় বিক্রি করে। আমরা প্রোফাইল তৈরি করছি না, হারাচ্ছি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাইট টু বি ফরগটেন আইন হয়েছে, কিন্তু তথ্য মুছে ফেলা অসম্ভব—কপি, আর্কাইভ, স্ক্রিনশট, ক্যাশে থাকে। ইন্টারনেট ভোলে না।

এই স্থায়ী স্মৃতি মানুষের বিকাশের জন্য বিপজ্জনক। আমরা ভুলের অধিকার, শোধরানোর সুযোগ, নতুন শুরু থেকে বঞ্চিত।

তথ্য নিয়ন্ত্রণ এখন ক্ষমতার নতুন রূপ। অতীতে অর্থ-পদ-শক্তি, এখন তথ্য সংগ্রহ-সংরক্ষণ-বিশ্লেষণ-প্রকাশ। এটা রাজনৈতিক অস্ত্র, অর্থনৈতিক সম্পদ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ।

আমরা বুঝি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি, আচরণ বদলাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবন উন্মুক্ত করি, ভাবি কিছু হবে না—কিন্তু গুরুত্ব পরে। ছবি, বন্ধুত্ব, মন্তব্য পরে সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

আমি বলছি না যে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু, তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা প্রস্তুত নই বলেই আমার মনে হয়। প্রযুক্তি চিকিৎসা উন্নত করেছে, শিক্ষা বিস্তৃত করেছে, দুর্নীতি উন্মোচন করেছে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে এবং আরও অনেক উপকার করছে। সমস্যা হচ্ছে আমরা ভাবছি মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে তা জমা হয়ে থাকছে।

কয়েকটা প্রশ্ন নিজেদের করি: গোপনীয়তা শর্তসাপেক্ষ? স্মৃতি স্থায়ী? ভুলে যাওয়া অসম্ভব? কৃতকর্মের বিচার সময়ের ওপর নির্ভরশীল? এসব শুধু এপস্টিন ফাইলের ক্ষমতাবানদের জন্য নয়, সবার জন্য।

  • ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক। [email protected]

  • (মতামত লেখকের নিজস্ব)