কক্সবাজারে ছয় খণ্ড করে কাটা পুরুষের মরদেহের পর এবার মাথা ও কবজিবিহীন এক নারীর লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। গতকাল শনিবার বিকেল চারটার দিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ জানারঘোনা এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরের পাড়ে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় লাশটি পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে অর্ধগলিত অবস্থার লাশটি উদ্ধার করে।
এ ঘটনার দুই দিন আগে গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া এলাকায় হোছনী খালের কালভার্টের নিচ থেকে বস্তায় ভর্তি ছয় খণ্ড মরদেহ উদ্ধার হয়। জেলা সদর ও টেকনাফে দুই দিনের ব্যবধানে এমন নৃশংস হত্যার ঘটনা পুলিশকে চিন্তিত করেছে। নারীর লাশের সঙ্গে মাথা ও হাতের কবজি পাওয়া যায়নি, আবার টেকনাফের মরদেহ থেকে হাতের চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছে। খুনিরা পরিচয় গোপন করার জন্য এ কৌশল অবলম্বন করেছে বলে পুলিশ মনে করছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জানানো মতে, ঝিলংজা থেকে উদ্ধার নারীর লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত না হলেও স্থানীয়দের তথ্য থেকে পুলিশ জেনেছে, নিহত নারী সাদিয়া আক্তার মুন্নি (২৮) হতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত রমজানের মাঝামাঝি সময়ে মুন্নি ও স্বামী সাইফুর রহমান দক্ষিণ জানারঘোনায় এক ভাড়া বাসায় ওঠেন। সাইফুর নিজেকে গাড়িচালক বলতেন, মুন্নি ছিলেন গৃহিণী। ঈদের পর থেকে তাঁদের কেউ দেখা যায়নি। স্বজনরা জানান, ২৭ মার্চ থেকে মুন্নি নিখোঁজ।
ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব পাল কুন্ডু। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে নিহতকে সাদিয়া আক্তার মুন্নি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি মহেশখালী উপজেলার জাগিরাঘোনা এলাকার বাসিন্দা। স্বামী সাইফুর রহমান এখন পলাতক। ‘ওই নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পেশাদার খুনির কাজ এটি,’ বলেন সঞ্জীব পাল।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো. ছমি উদ্দিন বলেন, ‘মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাতলা কম্বলে মোড়ানো ছিল। মাথা ও কবজি বিচ্ছিন্ন থাকায় এটি অত্যন্ত রহস্যজনক। আমরা এখনো নারীর মাথাটি উদ্ধার করতে পারিনি।’ আরও বলেন, ‘মুখমণ্ডল ও হাতের আঙুল না পাওয়ায় তাঁর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বজন দাবি করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ডিএনএ মেলানো হবে।’
দুই দিন আগের ঘটনায় টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়ায় হোছনী খালের কালভার্টের নিচে কয়েকটি বাজারের থলে ঘিরে কুকুরের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে পথচারীরা পুলিশে খবর দেন। থলে খুলতেই টুকরো করে কাটা পুরুষের ছয় খণ্ড মরদেহ বের হয়। বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ দুর্জয় বিশ্বাস বলেন, ‘ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেহটি টুকরা করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর গুমের জন্য বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যেন জোয়ারে ভেসে সাগরে চলে যায়।’ টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, খণ্ডিত অংশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে, পরিচয় এখনো অজানা।
তদন্তকারীরা বলছেন, দুই ঘটনাতেই খুনিরা পরিচয় গোপন করতে অত্যন্ত সচেতন। টেকনাফে হাতের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে যাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট না পাওয়া যায়, ঝিলংজায় মাথা ও কবজি আলাদা করে গুম করা হয়েছে। দুর্জয় বিশ্বাস বলেন, ‘এসব ধরন (প্যাটার্ন) স্পষ্টতই পেশাদার অপরাধী চক্রের ইঙ্গিত বহন করে। আমরা সম্ভাব্য সূত্র ধরে তদন্তে এগোচ্ছি।’ পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘খুনের ধরন ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নৃশংসতা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এটি তদন্তে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে কোনো অপরাধই শতভাগ নিখুঁত নয়। অপরাধীরা অজ্ঞাতসারে কোনো না কোনো ক্লু রেখে যায়।’






