প্রখ্যাত ভারতীয় গায়িকা আশা ভোসল মারা গেছেন। আজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন ছেলে আনন্দ ভোসলে। তাঁর বয়স ছিল ৯২ বছর। এই বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পীর মৃত্যুতে বিনোদনজগৎ শোকাহত। সংগীতক্ষেত্রের মানুষ থেকে শোবিজ তারকারা শোক প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশি গায়িকা বেবী নাজনীনও আশা ভোসলের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

দুই যুগ আগে ‘দুটি মনে এক প্রাণ’ অ্যালবামে আশা ভোসলের সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছিলেন বেবী নাজনীন। ফেসবুকে সেই স্মৃতি তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, “শোকাভিভূত হৃদয়ে, কৃতজ্ঞতা ও বিদায় জানাচ্ছি অতুলনীয় আশা ভোসলেজিকে। যখন সংগীতার কর্ণধার সেলিম খান সাহেব আমাদের দুজনকে “দুটি মনে এক প্রাণ” অ্যালবামের জন্য একত্র করেছিলেন, ২০০০ সালের শুরুর দিকে, তখন আমি শুধু একজন কিংবদন্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম না, আমি যেন সংগীতের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

স্টুডিওর সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বেবী নাজনীন আরও লিখেছেন, “স্টুডিওতে তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান। তাঁর বিনম্রতা ছিল তাঁর প্রতিভার মতোই অসীম। তিনি শুধু গান করতেন না—প্রতিটি সুরে, প্রতিটি কথায়, প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্তে তিনি যেন প্রাণ ঢেলে দিতেন।” বেবী নাজনীন শেষে লিখেছেন, “আট দশকজুড়ে সাড়ে বারো হাজারের বেশি গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, তবু স্টুডিওতে প্রতিটি গান গাইতেন যেন এটিই তাঁর প্রথম এবং শেষ গান। এটাই একজন সত্যিকারের কিংবদন্তির পরিচয়। পৃথিবী আজ তার সবচেয়ে বহুমুখী, সবচেয়ে প্রিয় কণ্ঠস্বরটি হারিয়েছে। কিন্তু তাঁর গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুরণিত হতে থাকবে—এমন প্রজন্মেও, যারা এখনো জন্ম নেয়নি। চিরসুরের মাঝে বিশ্রাম নিন, আশা দিদি।”

আশা ভোসল অনেক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন না। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে শোনা যায়, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। কিন্তু পরে নাতনি জানাই ভোসলে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান, “চরম ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণ”-এর কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ভারতীয় সংগীতের আইকনিক প্লেব্যাক গায়িকা আশা ভোসল আট দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। একাধিক ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি বিদেশি ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন তিনি। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ থেকে গজল—বিভিন্ন ধারায় অসাধারণভাবে মানিয়ে নিতে পারতেন।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোসলে। তাঁর বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার ব্যক্তিত্ব। অল্প বয়সেই বাবা মারা যান। পরিবারের দায়িত্ব নেন বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। সংগীতজগতে প্রবেশ ছিল কঠিন। শুরুতে বি ও সি গ্রেড সিনেমায় গান গাইতেন। মূলধারার গানগুলো ছিল লতার দখলে। ধীরে ধীরে নিজের স্বকীয়তা গড়ে তোলেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের বিরুদ্ধে গণপত রাও ভোসলেকে বিয়ে করেন। স্বামীর পরিবারের অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হন। শেষে সন্তানদের নিয়ে মায়ের বাড়ি ফিরে আসেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শক্তিশালী করে।

পরে সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের যৌথ কাজ ভারতীয় সিনেমার সুরের ধারা বদলে দেয়। ১৯৫০-এর দশকে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ১৯৬০-এর দশকে ‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমার গান তাঁকে শিখরে নিয়ে যায়। ক্যাবারে, গজল, পপ, শাস্ত্রীয়—সব ধরনের গানে সাবলীল ছিলেন। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’—এসব গান আজও জনপ্রিয়। তাঁর কণ্ঠের শক্তি ছিল অভিযোজন ক্ষমতা—রোমান্টিক ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ক্যাবারে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, পপ ‘দম মারো দম’, গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’। গাওয়া গানের সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি।

অনেকে নির্দিষ্ট ধারায় আটকে থাকলেও আশা ভোসলে বারবার নিজেকে নতুন করে গড়তেন। ১৯৯০-এর দশকে এ আর রাহমানের সঙ্গে কাজ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননা পান—‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’, ‘পদ্মবিভূষণ’, একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করেন এবং গ্র্যামি মনোনয়নসহ পুরস্কার পেয়েছেন।