‘দুপুরের দিকে আমি দরবারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম বেশ কয়েকজন মানুষ রড-লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। এরপর তারা দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু করে দেয়। স্লোগান দিতে দিতে দরবারের ভিতরে ঢুকে পড়ে। কয়েকজন ভাঙচুর শুরু করে। তারা দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায়। দরজা লাথি দিয়ে ভাঙে। ভিতরে বাবাকে গলা ধরে টেনে বের করে হাতের রড দিয়ে মারতে থাকে। এলোপাতাড়ি মাথায় মারতে থাকে। টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলতে থাকে, “বাইচে আছেরে এখনো, মারেক।”’
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরের এই কথাগুলো বলছিলেন নিহত পীর আবদুর রহমানের ভক্ত জামিরন। তাঁর পাশে বসে ছিলেন আরেক ভক্ত রিমা খাতুন। হামলার সময় জামিরনের ডান হাতের মাঝখানের আঙুলের মাঝখানে আঘাত লাগে। তিনি দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
আজ রবিবার বেলা ১১টার দিকে দরবারের সামনে একটি বাড়িতে বসে জামিরনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে আসা হয়। প্রথম যখন বাবাকে বের করা হয়, তখন বাবা হাতজোড় করেছিলেন। কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু এলোপাতাড়ি যেভাবে মারছিল, কেউ তাঁর কথা শোনেনি। নিচে নামিয়ে রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মাথায়, মুখে, নাকের ওপর কোপ ফেলতে থাকলে তখন একবার শুধু বলতে শোনা যায় ‘ইয়া মুরশিদ’। এরপর আর কোনো কথা বাবা বলতে পারেননি।
জামিরন আরও বলেন, লাঠিসোঁটা নিয়ে যারা এসেছিল, তাদের সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন। বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কেউ কেউ বড় ছিল। তিনি বলেন, ‘তাদের আসা দেখে আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কোনো আলোচনা করতে আসছে। কিন্তু তারা ভাঙচুর, হামলা, বাবাকে মেরে ফেলবে এটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝছি তারা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। পরিকল্পনা করে বাবাকে হত্যা করেছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা বলেন, পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন—কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। এরপর দুপুরের পর তারা ওই দরবারে হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যাচ্ছে। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের এক তলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তারা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোয় ভাঙচুর চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে চলে যান। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।






