কিশোরগঞ্জের হাওরে আর দিনকয়েক পরই বোরো ধান কাটা শুরু হবে পুরোদমে। এখন সর্বত্র প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ নিয়ে চাষ করা কৃষকরা খুশি নন, বরং দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁদের খেতে একই গোছায় বিভিন্ন জাতের ধান দেখা দিয়েছে। কোনোটা পেকে গেছে, কোনোটা আধা পাকা, আবার কোনোটার শিষই বেরোয়নি। ধান কীভাবে কাটবেন, তা নিয়ে কৃষকরা মাথা ঘামাচ্ছেন। পাকা ধান কাটলে আধা পাকা নষ্ট হবে, আধা পাকার জন্য অপেক্ষা করলে পাকাগুলো ঝরে যাবে।
জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে এমন অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলার হাওরে এই চিত্র স্পষ্ট। কৃষকরা রীতিমতো কাঁদছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮–এর বীজে মিশ্রণের জন্য এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন।
৩ কানি জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চিনন যায় না। অহন আমার খেতো অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শিষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম।হাবিবুর রহমান, কৃষক
গত শুক্রবার করিমগঞ্জের বড়হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করা কয়েক কৃষকের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। দুপুরের কড়া রোদে ধানখেতের পাশে বসে চিন্তিত ছিলেন গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০)। তিনি বলেন, ‘১৩ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চিনন যায় না। অহন আমার খেতো অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শিষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম। কোনডা কাডবাম। পাকনাডা কাটলে কাচাডা কাডন যাইতো না। ধারকর্জ কইরা চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলোঅইলে। অহন ১০০ মণ ফাইয়াম কি না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা দিব।’
সেখানে খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিকের (৪০) সঙ্গেও কথা হয়। তিনি ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী খেত, সিড ভিলেজ প্রদর্শনী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘ফ্লাড রিকন্সট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)’-এর আওতায় তাঁকে এই খেত করতে দেয়া হয়। বীজধান সরবরাহ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এখানেও একই অবস্থা। খেতে শুধু ব্রি-ধান ৮৮–এর জায়গায় বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। খেতের অর্ধেক ধান বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আশঙ্কায় আছেন ওমর সিদ্দিক।
বড়হাওরের মদন গ্রামের কৃষক আক্তার মিয়া (৬৫) ও জমির উদ্দিন (৫৫)-এরও একই অভিযোগ। তাঁরা জানান, ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করা সবার খেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে। ফলে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ঋণ করে চাষ করা কৃষকদের পথে বসবে।
আমরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল।মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, উপপরিচালক (বীজ বিপণন), বিএডিসি
জেলার হাওর উপজেলাগুলোর মাঠপর্যায়ে অন্তত ২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১০ হাজার হেক্টর জমিতে এমন অবস্থা হয়েছে। মোটকথা, বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮ বীজ রোপণকারী সবার খেতের অবস্থা কমবেশি একই। কৃষকরা বীজ কিনেছিলেন বিএডিসির অনুমোদিত স্থানীয় ডিলার ও সাবডিলারদের কাছ থেকে। ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজে নানা জাতের মিশ্রণ ছিল বলে জমিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে, পাকছে একেক সময়ে। এক গোছাতেই তিন-চার ধরনের ধান। এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে কৃষকরা দিশাহারা। কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও সমাধান পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলছেন, বিএডিসি চুক্তিভিত্তিক চাষিদের মানসম্মত বীজের কথা থাকলেও এবার বীজে ভেজাল ছিল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টরে। করিমগঞ্জ, ইটনাসহ কয়েক হাওরে এ জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কৃষি বিভাগ খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বললেন, মাঠপর্যায় থেকে সমস্যা শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছিলেন। তাঁরাও ব্রি-ধান ৮৮ বীজে মিশ্রণ নিশ্চিত করেছেন। ওই জমিতে কিছু ধান পেকে গেছে, কিছু আধা পাকা, কিছু কাঁচা, কিছুতে শিষই বের হয়নি। অর্থাৎ বিভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল ব্রি-ধান ৮৮ বীজের প্যাকেটে। এতে বোরো ফলনে সার্বিকভাবে বড় প্রভাব না পড়লেও কিছুটা প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কতটুকু জমি বা কতজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত, তার তালিকা তৈরি হচ্ছে। বিএডিসিকে জানানো হয়েছে।
বিএডিসি (বীজ বিপণন) জানায়, বোরো মৌসুমে শুরুতে ৩৭০ টন ব্রি-ধান ৮৮ বীজ সরবরাহ করেছে। পরে আরও ৩১৮ টন। বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ আসে। অভিযোগ পেয়ে কোথায় সমস্যা, তা তদন্ত চলছে।
বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ বলেন, ন্যাচারাল মিউটেশনের কারণে একই ফসলে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। সার-সেচের ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা রোপণ বা বীজের উৎসে ত্রুটিতেও এমন হতে পারে।
বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। আর আমাদের নিজস্ব কোনো উৎস থেকে, বিশেষ করে বিএডিসি যেসব জায়গা থেকে বীজ আনে, সেসব জায়গা থেকে যদি এমন বীজ এসে থাকে, তাহলে আমরা এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেব। আমরা তদন্ত শুরু করেছি। বিষয়টা আমরা দেখছি।’






