দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ নিয়ে চলমান বিভ্রান্তি দূর করতে জরিপ অধিদপ্তর আধুনিক জিএনএসএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন জরিপ শুরু করেছে। একসময় কেওক্রাডংকে সর্বোচ্চ বলা হলেও পরে তাজিংডং এবং সাম্প্রতিককালে সাকাহাফং নিয়ে দাবি-পাল্টা উঠেছে। এই বিতর্কের সিদ্ধান্ত ঘটাতে বান্দরবান ও রাঙামাটির নির্বাচিত পাহাড়গুলোতে জরিপ চলছে, যার ফলাফল আগামী মাসেই ঘোষণা করা হবে।
দীর্ঘদিন সরকারি নথিতে বান্দরবানের কেওক্রাডংকে দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। চলতি শতাব্দীর শুরুতে তাজিংডং এই স্থান পায়। কিন্তু জিপিএস প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বান্দরবানের শৌখিন পর্যটকরা সাকাহাফংকে সর্বোচ্চ বলে দাবি করছেন। এই বিভ্রান্তি সমাধানের জন্য জরিপ অধিদপ্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের একাধিক উঁচু পাহাড়ে জরিপকাজ শুরু করেছে।
জরিপ অধিদপ্তর বান্দরবানের কেওক্রাডং, সাকাহাফং ১-২, জৌতলাং, যোগিহাফং, আইত্লাং, তাজিংডং এবং রাঙামাটির দুমলং ও রাইংক্ষ্যং পাহাড়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছর পর সরকারিভাবে এ ধরনের জরিপ হচ্ছে। বান্দরবানের পাহাড়গুলোর মাঠজরিপ প্রায় শেষ, শুধু রাঙামাটির দুটি পাহাড় বাকি। এসব কাজ শেষ হলে তথ্য বিশ্লেষণ করে আগামী মাসে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ঘোষণা করা হবে।
বান্দরবান সার্কিট হাউসে গত শুক্রবার রাতে জরিপ অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুর-এ-আলম মোহাম্মদ যোবায়ের সরোয়ার এ তথ্য জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ পাহাড় নির্ধারণের জরিপ নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষা সার্ভে পরিচালক আব্দুর রউফ হাওলাদার, উপপরিচালক মেজর তৌহিদুল হক, মাঠ জরিপ দলের প্রধান দেবাশীষ সরকার ও জরিপ কর্মকর্তা বশির উদ্দিন।
জরিপ কাজে ২৭ জনের একটি দল চারটি উপদলে ভাগ হয়ে মাঠে নেমেছে। ২০২২ সালের একবার সর্বোচ্চ পাহাড় নির্ণয়ের জরিপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরে ৩৫ জনের একটি জরিপ দল থানচিতে কয়েকটি পাহাড় জরিপ করেছিল। কিন্তু ওই সময়ে রুমা ও থানচির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অশান্ত থাকায় জরিপ দলটি কাজ শেষ না করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
সার্ভেয়ার জেনারেল যোবায়ের সরোয়ার বলেন, দেশের সব কটি উঁচু পাহাড় পার্বত্য চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সর্বোচ্চ পাহাড় বান্দরবানে ও ২০ শতাংশ রাঙামাটিতে। গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ের জরিপকাজ চলছে। ৪ এপ্রিল জরিপ শুরু হয়। ইতিমধ্যে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় তাজিংডং, সাকাহাফং, জৌত্লাং পাহাড়ে মাঠ জরিপ শেষ হয়েছে। গতকাল শনিবার কেওক্রাডং পাহাড়ের জরিপ শেষ হয়। রাঙামাটির দুমলং ও রাইংক্ষ্যং পাহাড়ের জরিপ শেষ হলে মাঠের কাজ সম্পূর্ণ হবে। এই জরিপে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নির্ধারিত হবে এবং পাহাড়গুলোর খাড়ার মাত্রা ও ধসের ঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যাবে। নির্ভুল উচ্চতা জানলে পর্যটকদের আগমন বাড়বে।
‘দেশের সব কটি উঁচু পাহাড় পার্বত্য চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সর্বোচ্চ পাহাড় বান্দরবানে ও ২০ শতাংশ রাঙামাটিতে। গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ের জরিপ কাজ চলছে। ৪ এপ্রিল জরিপ শুরু হয়। ইতিমধ্যে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় তাজিংডং, সাকাহাফং, জৌত্লাং পাহাড়ে মাঠ জরিপ শেষ হয়েছে।’ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুর-এ-আলম মোহাম্মদ যোবায়ের সরোয়ার, সার্ভেয়ার জেনারেল, জরিপ অধিদপ্তর
জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরিপকাজে ২৭ জনের একটি দল চারটি উপদলে ভাগ হয়ে মাঠে নেমেছে। ২০২২ সালের একবার সর্বোচ্চ পাহাড় নির্ণয়ের জরিপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বরে ৩৫ জনের একটি জরিপ দল থানচিতে কয়েকটি পাহাড় জরিপ করেছিল। কিন্তু ওই সময়ে রুমা ও থানচির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অশান্ত থাকায় জরিপ দলটি কাজ শেষ না করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় নিয়ে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলছে। একসময়ে সরকারিভাবে প্রথমে কেওক্রাডং, তাজিংডংকে সর্বোচ্চ পাহাড় বলা হতো। কিন্তু পর্যটকদের তথ্যে অনেকে দাবি করেন, সাকাহাফং পাহাড় তাজিংডংয়ের চেয়ে উঁচু। এই বিতর্ক দূর করতে জেলা প্রশাসন থেকে ২০২২ সালে ২৩ মে পাহাড়গুলোর উচ্চতা পরিমাপের জন্য সার্ভেয়ার জেনারেলের কাছে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। দ্রুত সাড়া দিয়ে জরিপ দল এলেও পরিস্থিতির কারণে শেষ করতে পারেনি। সেই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য এবারে জরিপ দল এসেছে।
উল্লেখ্য, বান্দরবানে বেড়াতে যাওয়া অনেক পর্যটক নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন চূড়ার উচ্চতা মেপেছেন। এর মধ্যে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের দেওয়া তথ্য অনুসারে সবচেয়ে উঁচু পর্বত শৃঙ্গ হলো সাকাহাফং। জেলার থানচি উপজেলায় অবস্থিত সাকাহাফং-এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৫২ মিটার (৩ হাজার ৪৫১ ফুট)।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানের রুমা উপজেলার তাজিংডংকে দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। বিভিন্ন সরকারি নথি ও পুরোনো জরিপের তথ্য অনুযায়ী এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৩৩ মিটার (৩ হাজার ৩৮৯ ফুট)। এখনো অনেক পাঠ্যবই ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যে এই শৃঙ্গকে সর্বোচ্চ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে পর্যটকদের কাছে পরিচিত কেওক্রাডং একসময় দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। তবে পরবর্তী জরিপে এর উচ্চতা প্রায় ৯৮৬ মিটার (৩ হাজার ২৩৫ ফুট) নির্ধারিত হওয়ায় এটি এখন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে উচ্চতা নির্ধারণে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, সেখান থেকেই বিভ্রান্তির সূত্রপাত।






