সম্প্রতি ১৫ বছর বয়সী আলোচিত মডেলের বিয়ের সংবাদ এবং তারপরের প্রতিক্রিয়া আমাদের বাল্যবিবাহের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। বিয়ে হোক বা বিয়ের ঘোষণা, এ ঘটনা কেন্দ্র করে বাল্যবিবাহের প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

শিশুশিল্পীর বিয়ের খবরের লিংকের নিচে হাজার হাজার মন্তব্যে বাল্যবিবাহের প্রতি সমর্থন এবং অভিনন্দনবার্তা পড়ে হতভম্ব হতে হয়। কে বলবে, বাল্যবিবাহ এ দেশে নিষিদ্ধ এবং আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ!

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এত বিনিয়োগ, আয়োজন ও ক্যাম্পেইন সত্ত্বেও বাল্যবিবাহের পক্ষের শক্তি কখন যেন মহিরুহ হয়ে উঠেছে এবং সময় বুঝে দম্ভভরে তার উপস্থিতি জানাচ্ছে। নাজনীন আখতার মুক্তকণ্ঠতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণের শিরোনামে যথার্থই বলেছেন, ‘শ্রমজীবী থেকে তারকা পরিবার, বাল্যবিবাহ যখন মগজে’। অর্থাৎ বাল্যবিবাহের সমস্যা যতটা আর্থসামাজিক, তার চেয়েও বেশি মনঃসামাজিক।

উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আমাদের অবস্থান ওঠানামা করলেও গত দু-তিন দশকে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যথেষ্ট সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও এবং এর ক্ষতিকরতা জেনেও অভিভাবকেরা ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কন্যাদের বিয়ে দিয়ে দেন। এ দেশে প্রতি দুজনের মধ্যে একজন কন্যাশিশু এখনো বাল্যবিবাহের শিকার হয়।

২০২৫ সালে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ মা ও ৮৬.২ শতাংশ বাবা জানেন বাল্যবিবাহ তাঁদের সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এর ক্ষতিকরতা কেন ও কীভাবে হয় সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে বলে সেই গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে এই অভিভাবকেরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অবস্থান নেন না।

নব্বইয়ের দশকে উত্তরবঙ্গের এক জেলা শহরে আমি বেড়ে উঠেছি। তখনও বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাল্যবিবাহের শিকার কয়েক সহপাঠীর চেহারা এখনো মনে পড়ে। তবে একটা কথা বলতেই হবে—যে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত, তাদের আমরা ক্লাসে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতাম না।

নির্ধারিত বয়সের আগে বিয়ে করা বা দেওয়াকে আমাদের সময়ে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। অনেক অভিভাবক ভাবতেন, বিবাহিত মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা তাঁদের সন্তানকে বিয়ের পথে উৎসাহিত করতে পারে। তাই বিয়ে না দেওয়ার ব্যাপারে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে কঠোর মানসিকতা কাজ করত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং বিকৃত সামাজিক ধারণার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রচারণা গড়ে উঠছে, যা বাল্যবিবাহকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই শক্তি কখনো নীরবে এবং কখনো সরবে, অর্থাৎ যখন যেভাবে প্রয়োজন সেভাবে, অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে চলেছে।

নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি। দারিদ্র্যের হার তখন বর্তমানের চেয়ে উচ্চ ছিল, তাই বাল্যবিবাহের হারও বেশি। যৌতুক প্রথাও প্রচলিত ছিল—মেয়ের বয়স যত বড়, যৌতুক তত বেশি।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আজ মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা যৌতুকের জন্য বয়সের আগে মেয়ের বিয়ে দেয় না। যদি তা–ই হতো, তবে দরিদ্র পরিবারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের হার বাড়ত না।

২০২৩ সালে ব্র্যাকের প্রতিবেদনে দেখা গায়, দারিদ্র্য বড় কারণ হলেও ধনী-মধ্যবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিবাহের উচ্চ হার রয়েছে। দরিদ্র পরিবারে এ হার ৬০ শতাংশের মতো, তুলনামূলক কম দরিদ্র পরিবারে প্রায় ৬২ শতাংশ, মধ্যবিত্তে ৫৫ শতাংশ, উচ্চমধ্যবিত্তে ৫৪ শতাংশের বেশি এবং উচ্চবিত্তে ৫০ শতাংশের বেশি।

আজ সমাজের প্রায় সব স্তরে বাল্যবিবাহের পক্ষে নীরব এবং অনেক ক্ষেত্রে সরব সমর্থন তৈরি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের কঠোর অবস্থানও যেন মিলিয়ে গেছে। এই ‘সমর্থনের ঢেউ’ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং বিকৃত সামাজিক ধারণার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রচারণা গড়ে উঠছে, যা বাল্যবিবাহকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায়। এই শক্তি নীরবে বা সরবে, সুকৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, এদের থামাবে কে? এই পক্ষশক্তির জাল এত সুনিপুণভাবে পাতা হচ্ছে যে ছিঁড়ে বের হওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই সরকারের কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান এবং বাল্যবিবাহবিরোধী জনমত সৃষ্টির নতুন কৌশল প্রয়োজন।

শুধু সচেতনতা নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বাল্যবিবাহের পক্ষশক্তিকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে ফল ভয়াবহ হবে। এটি নিছক সামাজিক সমস্যা নয়, নারীর সামগ্রিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধক ভয়ংকর মহামারি। যেকোনো মূল্যে এই মহামারি থামাতে সময়োপযোগী ‘ভ্যাকসিন’ চাই।

  • নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী। [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব