আইন-কানুন এবং নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা এখনো কর্মসংস্থানের মূলধারায় ঢুকতে পারছেন না।

আমি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। জীবনের শুরু থেকেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে এসেছি। শিক্ষাজীবনে ঢোকা থেকে শুরু করে সেখানে টিকে থাকা—সবই ছিল অবিরাম সংগ্রাম। উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছি।

কিন্তু এই গল্পের প্রকৃত সংকট শুরু হয় শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে পা দেওয়ার পর।

একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ যখন সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে শিক্ষিত হয়ে ওঠে, তখন তার সামনে যে অনিশ্চয়তা দাঁড়িয়ে থাকে, তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এ আইনে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রবেশগম্যতা ও সম–অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ আইন মূলত নির্দেশনামূলক; এতে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলেও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ধরনের শাস্তি বা জবাবদিহি থাকবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে আইনটি অনেক ক্ষেত্রে কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা থাকার কথা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত সীমিত। অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অজুহাতে এই কোটা পূরণ করে না এবং এর জন্য কোনো কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হয় না।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘শ্রুতিলেখক (স্ক্রাইব) নীতিমালা’ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য সহায়তা প্রদান হলেও বাস্তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্বাধীনতা সীমিত করার একটি উপকরণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

চাকরির পরীক্ষায় একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থীকে শ্রুতলেখকের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা মানে তাকে একটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবদ্ধ করা। এতে তার ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হয়, যা প্রার্থীদের জন্য স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য কিংবা সম্মানজনক নয়। ফলে এটি সহায়তার পরিবর্তে একধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করে, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা নিজের যোগ্যতার চেয়ে ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এক অর্থে, এটি তাদের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্যদিকে, বর্তমানে দেশের চাকরির বাজারে তীব্র সংকট চলছে। এই সংকট সাধারণ প্রার্থীদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তা বহুগুণ কঠিন। কারণ সাধারণ প্রার্থীরা সীমিত সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে, কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা শুরুতেই কাঠামোগত বাধায় পিছিয়ে পড়েন। অর্থাৎ এটি তাদের জন্য ‘ডাবল বঞ্চনা’—একদিকে সীমিত সুযোগ, অন্যদিকে সেই সুযোগে প্রবেশের বাধা।

প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি: কেবল কার্যক্রম নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তনে প্রমাণ চাই।

প্রথমত, বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এ জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য শাস্তিমূলক ধারা সংযোজন করতে হবে, যাতে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

দ্বিতীয়ত, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নির্বাহী আদেশ ও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। কেবল কোটাভিত্তিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; কারণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উপযোগী পদ সৃষ্টি করতে পারে, যেমন টেলিফোন অপারেটর, তথ্যসেবা সহকারী, ব্রেইল ট্রান্সক্রিপশন, ডিজিটাল কনটেন্ট রিভিউ ইত্যাদি, যেখানে তাদের দক্ষতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ নিয়োগনীতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মপরিবেশ ও প্রশিক্ষণ—সবকিছু তাদের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও একটি সমন্বিত ও বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

আমরা কি এমন একটি সমাজ মেনে নেব, যেখানে একজন মানুষ তার অক্ষমতার কারণে নয়; বরং ব্যবস্থার অক্ষমতার কারণে পিছিয়ে পড়বে, নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সক্ষমতার বিচার হবে, সীমাবদ্ধতার নয়? সিদ্ধান্ত আমাদের—নীরব দর্শক হয়ে থাকব, নাকি পরিবর্তনের অংশ হব?

এ ছাড়া প্রযুক্তিগত সহায়তা, যেমন স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল ডিসপ্লে ও অন্যান্য সহায়ক সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তাই শুধু নিয়োগ নয়; কর্মপরিবেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে কেবল নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, ‘শ্রুতিলেখক নীতিমালা’কে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে এটি নিয়ন্ত্রণের নয়; বরং প্রকৃত সহায়তার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। প্রার্থীর স্বাধীনতা, পছন্দ ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থত, নিয়োগপ্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে, যাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সরাসরি নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রকে তার দায় স্বীকার করতে হবে। কারণ, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যখন সব বাধা অতিক্রম করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায় না, তখন তা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং এটি একটি নীতিগত ও কাঠামোগত ব্যর্থতা। আমার এ অভিজ্ঞতা কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন।

এখন প্রশ্নটা আপনাদের কাছে—আমরা কি এমন একটি সমাজ মেনে নেব, যেখানে একজন মানুষ তার অক্ষমতার কারণে নয়; বরং ব্যবস্থার অক্ষমতার কারণে পিছিয়ে পড়বে, নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সক্ষমতার বিচার হবে, সীমাবদ্ধতার নয়? সিদ্ধান্ত আমাদের—নীরব দর্শক হয়ে থাকব, নাকি পরিবর্তনের অংশ হব?

  • মো: ইকবাল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

ই–মেইল: [email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব