লম্বা টেবিলের এক প্রান্তে গুটিসুটি হয়ে বসে ছিলেন মোহাম্মদ নূর ইসলাম। প্রথম দর্শনে কল্পনাও করিনি, তিনি এত অভাবনীয় এক গল্প নিয়ে এসেছেন।

সাজ্জাদ ভাই (মুক্তকণ্ঠর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ) আগেই খানিকটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এনজিও কর্মী নূর ইসলাম তালেবানের হাতে ৮৪ দিন বন্দী ছিলেন। ২০০৭ সালের পত্রিকা দেখে তাঁর সম্পর্কে আগেই কিছু পড়ে নিয়েছিলাম। তখন মুক্তকণ্ঠর শনিবারের ক্রোড়পত্র ছুটির দিনেও তাঁকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রচ্ছদকাহিনি ছাপা হয়েছিল। কিন্তু পুরো ঘটনার এত মোড়, এত চরিত্র, এত রোমাঞ্চ—এসব কল্পনার বাইরে ছিল।

নূর ইসলাম ভাইয়ের বয়ানে সেই অভিজ্ঞতা লিখেছিলাম। ছাপা হয় মুক্তকণ্ঠর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৩’–এ। তিনি নিশ্চয়ই ভাবেননি, তাঁর গল্প পরিচালক রেদওয়ান রনির চোখে পড়বে এবং সেই কাহিনি অবলম্বনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দম তৈরি হবে।

মনে আছে, প্রথম দেখাতেই তিনি হড়বড় করে একধাক্কায় ৮৪ দিনের ঘটনা বলে ফেলতে চাইছিলেন। তাঁর গল্পে কখনো সহকর্মীদের কথা আসছিল, কখনো তালেবান বিদ্রোহীদের কথা, কখনো একটা গাধার কাহিনি। মানুষটা দারুণ গল্পকথক। দ্রুত মনোযোগ কাড়েন। কিন্তু এত দিনের জমানো কথা একসঙ্গে বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন।

তাঁকে শান্ত করে বললাম, ‘চা খাবেন?’

‘খেতে পারি। রং চা।’

কিছুক্ষণ পর নূর ইসলাম ভাইয়ের সামনে চায়ের কাপ রেখে বললাম, ‘চলেন ভাই, আমরা শুরু থেকে শুরু করি।’

সেদিন মোহাম্মদ নূর ইসলামের সঙ্গে পাক্কা দুই ঘণ্টা কথা বলেছিলাম। এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে পুরোনো অডিও শুনতে গিয়ে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়।

নূর ইসলাম ভাই তাঁর পুরো অভিজ্ঞতা একটা ডায়েরিতে লিখেছিলেন। আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল তাঁর সঙ্গে কথা বলে, ডায়েরি পড়ে তাঁর বয়ানেই ঘটনা লেখা। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে মনে হলো কোথাও অপূর্ণতা রয়ে যাচ্ছে। নূর ইসলাম ভাইয়ের স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন রানির অংশ না শুনলে পুরোটা স্পষ্ট হয় না।

তাই কদিন পর ফরিদপুরে গেলাম। রানি ভাবির সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি আরেক উদ্দেশ্য ছিল। নূর ইসলাম ভাই আগেই দাওয়াত দিয়েছিলেন, ‘বাড়ি এলে আপনাকে আফগানি গরুর মাংস রান্না করে খাওয়াব।’

মাংস চুলায় বসিয়ে স্বামী-স্ত্রী আমার মুখোমুখি বসলেন। এবার গল্পটা নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। বন্দী অবস্থায় নূর ইসলাম ভাইয়ের লড়াই তো আছেই, দেশে তাঁর স্ত্রীর লড়াইও কম নয়। সমাজ থেকে শুরু করে সরকার, অনেকের সঙ্গে একা লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।

কীভাবে দুজনের পরিচয় হয়, বিয়ে হয়; নূর ইসলাম আফগানিস্তানে যান কীভাবে, ফিরে আসার পর জীবনে কী ঘটে—সব খুঁটিয়ে শুনেছিলাম। ডায়েরিতে নোট নিতে নিতে মনে হলো, এ তো পুরো সিনেমা!

বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার যে লড়াই, যে অদম্য স্পৃহা; এটাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। যেহেতু এটা তথ্যচিত্র নয়, বড় পর্দার ছবি; তাই অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। কিন্তু অনুপ্রেরণাটা আমি ছবিতেও রাখতে চেষ্টা করেছি।
রেদওয়ান রনি, পরিচালক, দম

লিখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ঘোরে ঢুকে পড়েছিলাম। কখনো হেডফোনে রেকর্ডিং শুনছি, কখনো ডায়েরির পাতা ওলটাচ্ছি, কখনো গুগল বা বই করে আফগানিস্তানের তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা বুঝছি—সব মিলিয়ে পাগল-পাগল ভাব। তার ওপর সময় কম। ঈদসংখ্যা বাজারে যাবে। সাজ্জাদ ভাই বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন, ‘হলো?’

যথাসময়ে লেখা জমা দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। পাঠকের হাতে পৌঁছার পর ঘোর কাটতেই পরিচালক রেদওয়ান রনি ফোন করলেন। বললেন, ‘নূর ইসলামের কাহিনি পড়ে আমার চোখে পানি এসে গেছে! আমি এটা নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে চাই।’

পরের ঘটনা সবাই জানেন। দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে মহাসমারোহে চলছে দম—নূর ইসলামের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রেদওয়ান রনির চলচ্চিত্র। সিনেমায় অনেক ক্ষেত্রে কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, কাহিনিতে যোগ-বিয়োগ হয়েছে। কিন্তু মূল বক্তব্য এক—একজন সাধারণ মানুষের টিকে থাকার গল্প, দম ধরে রাখার গল্প, বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে বাড়ি ফেরার গল্প।

কদিন আগে নূর ইসলাম ভাই মুক্তকণ্ঠর কার্যালয়ে এলেন আবার। এবার একা নয়। রানি ভাবির সঙ্গে ছিলেন পরিচালক রেদওয়ান রনি, অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো ও পূজা চেরী। পর্দার ও বাস্তবের নূর-রানির সঙ্গে আড্ডা হলো।

নূর ইসলাম ভাই বলছিলেন, ‘খুব ইচ্ছা ছিল, আমার ঘটনাটা সারা দেশের মানুষ জানুক। আমি যদি না থাকি, তখন হলেও জানুক। সে জন্যই ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলাম। রনি ভাই যেদিন বললেন, আমার ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাবেন, তার পর থেকে অপেক্ষা আর ফুরাচ্ছিল না। আশপাশের অনেককে বলতাম, জানেন, আমাকে নিয়ে রেদওয়ান রনি সিনেমা বানাচ্ছে। তাঁরা ভাবত, লোকটা পাগল হয়ে গেছে। অবশেষে স্বপ্নটা পূরণ হলো।’