ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলায় কৃষি ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। কৃষিজমির সুরক্ষা আইনকে অগ্রাহ্য করে একদল প্রভাবশালী মাটিখেকো সিন্ডিকেট রাতের অন্ধকারে শত শত ট্রাক-পিকআপে ফসলি জমির উপরিভাগ (টপ সয়েল) ইটভাটায় পাচার করছে। শুধু কৃষিজমি নয়, খাসজমি, খাল ও নদীর তীর থেকেও বেপরোয়ায় মাটি কাটা হচ্ছে। এই মাটির ব্যবসা কেবল মাটির উর্বরতা শক্তিকেই ধ্বংস করছে না, বরং খুন, অপহরণ ও রাজনৈতিক সংঘাতের মতো ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নে মোট কৃষিজমির প্রায় অর্ধেকই এখন মাটি ব্যবসায়ীদের কোদালের কোপে ক্ষতবিক্ষত। করের ছড়া খালের ওপর বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে। এর ফলে কৃষিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। চলতি বোরো মৌসুমে শুধু এক ইউনিয়নেই ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্ভব হয়নি। কৃষি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাটির ওপরের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চির মধ্যে থাকা জৈব উপাদান একবার চলে গেলে জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়। অর্থাৎ এক রাতের মুনাফার জন্য ফেনীর কৃষির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে, এই অন্ধকার ব্যবসার মূলে রয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। মাটি কাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে গত কয়েক মাসে ফেনীতে যুবদল কর্মী খুন হওয়া থেকে শুরু করে ছাত্রদল নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো কিছু নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে মাটি কাটা ও পাচার একবিন্দু কমেনি।
জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও জেল দিলেও এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে তারা জেল-জরিমানাকে ‘ব্যবসায়িক খরচ’ হিসেবে ধরে নিয়েছে। অভিযানে মেশিন জব্দ করার খবর পাওয়ার আগেই তারা সটকে পড়ে এবং বিকল্প পথ তৈরি করে পাচারকাজ অব্যাহত রাখে। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—শত শত ট্রাক প্রতি রাতে জেলাজুড়ে মাটি পরিবহন করছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন তাদের শুরুতেই রুখতে পারছে না?
আমরা মনে করি, কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে এই মহাবিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। যেসব ইটভাটা কৃষিজমির এই অবৈধ মাটি কিনছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মাটি পরিবহনকারী সব যানবাহন ও সেসবের মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ‘অব্যাহতি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাটির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে বর্জন ও আইনগতভাবে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।






