মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর আঘাত হানতে পারে—এই স্পষ্ট সতর্কবার্তা জারি করেছে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ। এর সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং সরাসরি মানুষের জীবিকা ও দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব পড়বে। প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে না। এটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা, বৈশ্বিক ঝুঁকির প্রতি প্রস্তুতির অভাব এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই গতি ধীর হয়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের ধারা এখন ঝুঁকাপূর্ণ। আরও উদ্বেগজনক যে, নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ ইতিমধ্যে দরিদ্র হয়েছে। এই পটভূমিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে।
প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আমদানি খরচ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী চাপে ডেকে এনেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে, যা এখন সাড়ে ৮ শতাংশের কাছাকাছি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়, ফলে তারা দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ করতে পারে না।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা কয়েক মাস আগে ধরা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কম। এই পতন শুধু সামগ্রিক অর্থনীতির দুর্বলতা নির্দেশ করে না, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও ভোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা দারিদ্র্য হ্রাসের গতি ব্যাহত করে।
বিশ্বব্যাংক যে ছয়টি খাতে যুদ্ধের প্রভাব চিহ্নিত করেছে, তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভগুলো ঝুঁকির মুখে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য, জ্বালানি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ থেকে বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা—সবই পরস্পর সংযুক্ত। এগুলোর বৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্য তীব্র করে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? বাস্তবে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনও নাজুক—রাজস্ব আহরণ কম, ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত। ফলে বড় বাহ্যিক ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্যও সীমাবদ্ধ, সরকারের হাতে সংকট মোকাবিলার অস্ত্র কম।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অতীত নয়। বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের পরামর্শ বাস্তবায়ন করলে উন্নতি সম্ভব। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি দরকার। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজস্ব বাড়াতে কর ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা। বিনিয়োগ পরিবেশ সহজতর করা, নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানো ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য বহিরাগত সংকট হলেও, এর প্রভাব মোকাবিলা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর। তাই এখনই বাস্তবতা মেনে দ্রুত সংস্কারে কাজ শুরু করার সময়। না হলে দারিদ্র্যের ছায়া আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।






