প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলি, যা প্রথমদৃষ্টিতে বিপরীতমুখী মনে হতে পারে। ইরানে চলছে এমন যুদ্ধটিকে ‘ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের’ বলা হচ্ছে, কিন্তু এটি মূলত জায়নবাদী প্রোপাগান্ডা। এই নামকরণের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদকে দমন করা।

বাস্তবে এটি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই ইসরায়েলের যুদ্ধ। এখানে যুক্তরাষ্ট্র বলতে আমি সেই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের বুঝাচ্ছি, যাঁরা এই যুদ্ধের বিরোধী এবং নিজ দেশের মধ্যেই ইসরায়েলি আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরকার ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষাকারী গোষ্ঠী এই যুদ্ধকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলি-মার্কিন’ জোটের যুদ্ধ হিসেবে বিশ্বের কাছে বাজারজাত করতে চায়, কিন্তু তারা সফল হবে না।

লক্ষ করুন, নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো যুদ্ধবিরোধী সমালোচনাকে প্রকৃত অপরাধী ইসরায়েল ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর না ফেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ফেলে মার্কিন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে। এতে গণহত্যাকারী জায়নবাদীদের থেকে মানুষের ক্ষোভকে বিভ্রান্ত প্রেসিডেন্টের দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধ শুরু করেছেন ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু—ট্রাম্প নন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও নন।

এটি এমন যুদ্ধ যা ইসরায়েল একই সঙ্গে ইরান এবং যুদ্ধবিরোধী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে চালিয়েছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক তাঁদের দেশকে ইসরায়েলের শ্বাসরুদ্ধকর কবজা থেকে মুক্তি চান। সেটেলার কলোনি বা বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশের জন্য অর্থায়ন করে নিজেদের অধিক মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁদের।

মার্কিন রাজনীতিতে গণহত্যাকারী জায়নবাদ থেকে সরে আসার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলপন্থী লবি গ্রুপগুলোর এই ইরানের ওপর ইসরায়েলি যুদ্ধ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

ইসরায়েল আমেরিকান ফ্রন্টেও হেরেছে। একের পর এক জরিপ ও একের পর এক প্রতিবাদ দেখাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল যা করেছে, এর জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটিকে ঘৃণা করে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। রাজনৈতিক প্রার্থীরা আজ প্লেগ থেকে দূরে থাকার মতো ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক এড়িয়ে চলছেন।

নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে এই যুদ্ধের স্বপ্ন দেখছেন এবং অবশেষে ট্রাম্পকে ইরানের ওপর আক্রমণে যোগ দিতে প্ররোচিত করতে সফল হয়েছেন। ওভাল অফিসের সেই স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিকে তিনি নিপুণভাবে প্ররোচিত করেছেন। ট্রাম্প স্পষ্টতই এই বোকামি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিলেন, কিন্তু তিনি এতটাই নির্বোধ ও অহংকারী যে তা স্বীকার করতে চাইছিলেন না।

ইসরায়েলের কথামতো কাজ করে ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীকে কার্যত ‘প্রক্সি ফোর্স’ বা ছায়া বাহিনীতে পরিণত করেছেন, অর্থাৎ কাপুরুষ সেটলার কলোনির ব্যক্তিগত সেনাবাহিনীতে। লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক এই ঐতিহাসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তাঁরা তাঁদের দেশ ফেরত চান।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ইসরায়েলকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা—এমনকি রক্ষণাত্মক সহায়তাও—দেওয়ার বিরোধিতা করবেন।

এই প্রবণতা রিপাবলিকান পার্টির মাগা আন্দোলনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে; টাকার কার্লসন, নিক ফুয়েন্তেস ও ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো জনপ্রিয় ভাষ্যকারদের কথা শুনলেই তা বোঝা যায়। ইসরায়েলি ও মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা, সেতু এবং একটি সার্বভৌম জাতির অন্যান্য অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে লাখ লাখ মার্কিনকে বিক্ষুব্ধ করে।

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ কেন? উত্তর সহজ: প্রথমত, গাজায় গণহত্যা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি দখল ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধ থেকে বিশ্বের দৃষ্টি সরানো। কিন্তু সর্বোপরি, ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, সিরিয়ান ও ইরানিদের বিরুদ্ধে—পুরো অঞ্চলের বিরুদ্ধে—এই নৃশংস যুদ্ধগুলো তাদের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েলের বিভ্রান্তিকর পরিকল্পনার অংশ।

অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধী, কিন্তু অধিকাংশ ইসরায়েলি সমর্থক। তাই এটি মূলত ইসরায়েলি যুদ্ধ—কোনো ‘মার্কিন–ইসরায়েলি’ যুদ্ধ নয়।

ট্রাম্প ও তাঁর জায়নবাদী কুশীলবেরা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে দমনের জন্য ভিন্নমতীয় কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক—বাম, ডান ও মধ্যপন্থী—যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও তাঁরা প্রকাশ করেছেন—তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ইসরায়েলের হয়ে যুদ্ধে পাঠাতে ক্লান্ত।

ইরানের ওপর ইসরায়েলি যুদ্ধ মূলত মার্কিনদের ওপর তাদের বৃহত্তর যুদ্ধের অংশ। ইসরায়েল নীতিমান ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি পুরো মার্কিন প্রজন্মকে হারিয়েছে। যে সংবাদমাধ্যম ও লবি গ্রুপ ইসরায়েলকে সমর্থন করে, তারাও ইসরায়েলের সঙ্গে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা ভেবেছিল ইসরায়েল-সমালোচক নিরপরাধ শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ইহুদিবিদ্বেষ’-এর অপবাদ ছুড়ে ভিন্নমতের নৈতিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করবে। কিন্তু মার্কিন এই প্রজন্ম আর প্রতারিত হবে না।

ইসরায়েল এই উভয় যুদ্ধেই হারছে। হ্যাঁ, নেতানিয়াহু একটি পরাশক্তিকে প্ররোচিত করে গাজায় গণহত্যার মডেলে এই যুদ্ধে যোগ দিতে ও ইরানি শিশুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাতে বাধ্য করেছেন, যা জায়নবাদী প্রকল্পের ইউরোপীয় বর্বরতার নিদর্শন। কিন্তু ইরান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং কঠিন আঘাতের পর ঘুরে দাঁড়ানো ও অটল প্রতিরোধের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।

ইসরায়েল আমেরিকান ফ্রন্টেও হেরেছে। একের পর এক জরিপ ও প্রতিবাদ দেখাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল যা করেছে, এর জন্য ইহুদি রাষ্ট্রকে ঘৃণা করে আমেরিকার জনগণ। প্লেগ থেকে দূরে থাকার মতো রাজনৈতিক প্রার্থীরা ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক এড়িয়ে চলছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিনরা এই গ্রীষ্মে কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে নয়, ফিলিস্তিনের মাঝখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃক সৃষ্ট ইসরায়েল থেকেও মুক্তির উৎসব উদযাপন করবে।

  • হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত ও ঈষৎ সম্পাদিত অনুবাদ: রাফসান গালিব