গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টা। ছুটির দিন হওয়ায় বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারে দর্শনার্থীদের বেশ ভিড়। এখানকার বিশাল দিঘির কুমির দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকে এসে ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

মাজারের দক্ষিণে দিঘির প্রধান ঘাট। কুমির তখন ঘাটের কাছে না থাকলেও সবার আলোচনায় ছিল কুমির। পেছন থেকে একজন বলছিলেন, ‘দেখছিলি, এইখানেই কিন্তু কুকুরটা ধরছিল।’ শুনে আরেকজন বলে উঠলেন, ‘এরা কুকুর খেতে দিল কেন?’ তাঁদের কাছে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে, জানেন নাকি কিছু?’

কথায় কথায় দর্শনার্থীরা নিজেদের স্মার্টফোন থেকে ফেসবুকের ছবি ও ভিডিও দেখালেন। খুলনার রূপসা উপজেলার নৈহাটি এলাকার কলেজশিক্ষার্থী সুমন বলেন, ‘দেখছেন, একেকটা ভিডিও কত ভিউ, মিলিয়ন, মিলিয়ন। কুকুরটাকে নাকি এখানে কুমিরকে খেতে দিছিল।’

এক পোস্টে চোখ আটকাল যেখানে মারুফ হৃদয় নামের একজন এআই দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘একটা কুকুর বাঁচার জন্য ছটফট করছিল। কেউ একজন অবলা জীবটাকে দিঘির ঘাটে কুমিরের সামনে দিয়ে গেছে, মজা করে। সবাই দাঁড়িয়ে ভিডিও করতেছিল। কিন্তু কেউ বাঁচাতে আসেনি, বরং সবাই মজা নিচ্ছিল।...’ এই পোস্টে শত শত কমেন্ট।

দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাজারের দিঘিতে কুমিরের কুকুর ধরার ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। লাখো মানুষ দেখছেন, মন্তব্য করছেন। কেউ ভিডিও-ছবি শেয়ার করে লিখছেন, কুকুরটিকে পা বেঁধে ফেলা হয়েছে কুমিরকে খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু মাজারের খাদেমরা বলছেন, কুকুরটিকে কুমিরের খাবার হিসেবে দিঘির পানিতে ফেলা হয়েছে—এ দাবি একেবারে মিথ্যা।

মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাপ্রহরী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে, ঘটনাটি ৮ এপ্রিল, বুধবার বিকেলের। দিঘির কাছে একটি অসুস্থ কুকুর শিশুসহ কয়েকজনকে কামড় দেয়। কয়েকজন তখন লাঠি ছুড়ে কুকুরটিকে তাড়ায়। কুকুরটি নারীদের ঘাট থেকে মূল ঘাটের দিকে দৌড়ায়। সেখানে মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী ফোরকানকে আঁচড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায়। এরপর কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। ফেসবুকে ছড়িয়েছে শুধু ওই অংশটুকু।

প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক তরুণ বলেন, কুকুরটা কিছুটা অসুস্থ ছিল। মাথার কাছে একটা ক্ষত দেখা যাচ্ছিল। সেদিন মাজারে বেশ কয়েকজনকে কামড় দেয়। দুই-তিনটা মুরগিও মেরে ফেলে। সামনে যাকে পায়, তাকে তাড়া করে। এক নারী দোকানি কুকুরটিকে তাড়া করেন। ওই নারী ছাড়া দু-তিনজন লাঠি ছুড়ে মারেন। তখন পায়ে আঘাতও হয়তো পায়। তাড়া খেয়ে নারীদের ঘাট দিয়ে প্রধান ঘাটে যায়। সেখানে নিরাপত্তাকর্মীকে আঁচড় দেয়।

ভিডিওতে নীল শার্টের এক ব্যক্তি দেখা যায়, তিনি মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. ফোরকান হাওলাদার। কুকুরে আঁচড়ে বৃহস্পতিবার বাগেরহাট জেলা হাসপাতাল থেকে টিকা নেন তিনি। সেই ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে মো. ফোরকান হাওলাদার বলেন, ‘গত বুধবার একটা পাগলা কুকুর এসে দু–তিনজনকে কামড়ায়। আমি দিঘির ঘাটে ছিলাম। সেখানে কুমির আসছে, তাই কোনো গেস্ট যেন পানিতে না নামে, তাই সবাইকে সতর্ক করছিলাম। তখন কুকুরটা ওইখানে আসে। আমি যখন সরায় দিতে গেছি, তখন আমারও পায়ে কামড় দিছে। তারপর ঝাড়া দিলে কুকুরটাকে কুমিরে ধরে নিয়ে গেছে।’

দিঘির পাড়ের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, তাঁর দোকানের সামনেও কয়েকজনকে আক্রমণ করে কুকুরটি। তিন বছরের একটা বাচ্চাকেও কামড়ায়। কুকুর পানিতে পড়লে কুমির ধরে নিয়ে যায়। এ নিয়ে নানা মিথ্যা গল্প বানানো হচ্ছে।

দিঘির কুমিরের সঙ্গে সখ্য গড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, ‘গেল পূর্ণিমার দিন দিঘির এই কুমিরটা ডিম পেড়ছে। এ সময় মাদী কুমির একটু হিংস্র হয়ে যায়।’ ঘটনার সময় বাগেরহাটে ছিলেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফোরকান ভাইকে কুকুরটা পায়ে আঁচড় দেয়। এরপর সে পা ঝাঁকা দিলে কুকুরটা কুমিরের সামনে গিয়ে পড়ছে। হিংস্র কুমির, তার সামনে গিয়ে তো সাধারণ কেউ টেনে তুলতে পারবে না। আমি থাকলে হয়তো চেষ্টা করতাম। কিন্তু অন্য কেউ গেলে তো আরও বিপদ হতে পারত!’

মেহেদী হাসানের মতে, ঘটনা নিয়ে নানা মিথ্যা গল্প ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। মাজারের খাদেমরা জানান, এখন দিঘিতে একটিমাত্র কুমির। এটা খানজাহান (রহ.)-এর রেখে যাওয়া সেই কুমির নয়। কুমির বিলুপ্তির দিকে যাওয়ার উপক্রম হলে ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে এই কুমির ছাড়া হয়।