বাংলাদেশের আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। বিশেষ করে, দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী দলে থাকা বিএনপি ক্ষমতাসীন দলের আমলে ধারাবাহিকভাবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি করে এসেছে। তাদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করা, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।
এই দাবিগুলোর পিছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করেছে। বিএনপি নিজেই বারবার অভিযোগ তুলেছে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগ ব্যবহার করে তাদের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিতর্কিত মামলায় দণ্ডিত করা, কারাবন্দী রাখা এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে বাধা দেওয়া—এগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাবের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের শিকার হয়েছিলেন এবং বিভিন্ন মামলার কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
বিএনপি বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ থাকলে তাদের নেতা-কর্মীদের বিচারিক হয়রানির মুখোমুখি হতে হতো না। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থানে একটা বৈপরীত্য লক্ষণীয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার পর, এখন অনেকের কাছে বিএনপির অবস্থান অসংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে। তারা অতীতে ৩১ দফা কর্মসূচি, জুলাই সনদ, নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ এবং গণভোটের আহ্বানেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পৃথক সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগে উপযুক্ত আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ সংসদে বাতিলের জন্য বিল তোলায় বিএনপির বিরুদ্ধে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার অভিযোগ উঠেছে।
আপিল বিভাগ থেকে অন্য কোনো আদেশ না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় মানা বাধ্যতামূলক। কেননা হাইকোর্টে রায়ের বিষয়ে আপিল বিভাগের কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ নেই।
এই প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয় নির্ধারণ করে এবং এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ছিল। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয় এবং পরবর্তীতে পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান যুক্ত হয়।
জনস্বার্থে করা একটি মামলায় ২০২৫ সালে প্রদত্ত রায়ে, যার পূর্ণাঙ্গ পাঠ ৭ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে, হাইকোর্ট ১১৬ অনুচ্ছেদকে ১৯৭২ সালের অবস্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।
স্বাধীন বিচার বিভাগ: সংসদ আইন না করলে অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আপিল বিভাগ থেকে অন্য কোনো আদেশ না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় মানা বাধ্যতামূলক। কেননা হাইকোর্টে রায়ের বিষয়ে আপিল বিভাগের কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ নেই। তাই হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পৃথক সচিবালয়ের কার্যক্রম যদি চলমান না থাকে অথবা অধস্তন আদালত যদি সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তাহলে তা হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এতে আদালত অবমাননা হতে পারে।
যেহেতু স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত, তাই নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করব, ১১৬ অনুচ্ছেদ মামলায় হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগেও বহাল থাকবে এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হবে এবং এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় কার্যকর থাকবে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব






