তরুণ বয়স স্বপ্নের বীজ রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কিন্তু আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজের কাঠামো প্রায়শই তরুণদের শেখায় কীভাবে 'ভালো চাকরি' পাওয়া যায় এবং মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন হাতে নেওয়া যায়।
রবার্ট কিয়োসাকির অমর গ্রন্থ ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ এর উল্টো দিকটি তুলে ধরে। বইটির মূল শিক্ষা—টাকার জন্য না খেটে টাকাকে নিজের জন্য খাটানোর পথ বের করা। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এ শিক্ষা কেবল জরুরিই নয়, বরং অপরিহার্য।
কিয়োসাকি তাঁর বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, স্কুল-কলেজ আমাদের পেশাগত দক্ষতা দিলেও ‘আর্থিক বুদ্ধিমত্তা’ বা আর্থিক সাক্ষরতা শেখায় না। একজন মেধাবী ছাত্র চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হয়ে প্রচুর আয় করলেও, মাস শেষে ঋণের জালে আটকে বা সঞ্চয়ে অক্ষম হলে তার আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি স্পষ্ট হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দৃশ্য আরও চিন্তার। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে আর্থিক সাক্ষরতার হার মাত্র ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৭২ শতাংশ মানুষ ব্যাংকঋণ বা বিনিয়োগের প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখেন না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ছুঁয়েছে, ফলে নির্দিষ্ট বেতনে জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এছাড়া কর্মসংস্থান সংকটের কারণে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১১ শতাংশ, অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সামগ্রিক বেকারত্ব ছিল ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যেটা তরুণদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু বেতনের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়া যায় না; আয়ের নতুন উৎস খোঁজা এবং সঠিক বিনিয়োগের ধারণা গ্রহণ করা জরুরি।
আর্থিক সাফল্যের প্রথম ধাপ হলো সম্পদ ও দায়ের পার্থক্য বোঝা। কিয়োসাকির মতে, সম্পদ বলতে বোঝায়, ‘যা আপনার পকেটে নিয়মিত টাকা নিয়ে আসে।’ যেমন ব্যবসা, ভাড়া পাওয়া যায় এমন জমি বা বাড়ি, শেয়ার বা বন্ড। অন্যদিকে দায় বলতে বোঝায়, ‘যা আপনার পকেট থেকে টাকা বের করে নেয়।’ যেমন বিলাসিতা, উচ্চ সুদে ঋণ বা দামি গ্যাজেট কেনা।
অনেকে নিজের থাকার বাড়িকে সম্পদ মনে করেন। কিন্তু সেই বাড়ির ঋণকিস্তি মেটাতে সঞ্চয় কমে গেলে তা আসলে ‘দায়’ হয়ে দাঁড়ায়। তরুণদের ক্যারিয়ার শুরুতে দামি স্মার্টফোন বা শৌখিনতায় খরচ না করে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎসে বিনিয়োগ করা উচিত।
আজকের তরুণরা তাড়াতাড়ি সাফল্য চায়। কিন্তু ‘রিচ ড্যাড’ শেখায়: ‘টাকার জন্য নয়, শেখার জন্য কাজ করুন।’ ক্যারিয়ারের প্রথম দিনে শুধু বেতন না দেখে শেখার সুযোগ বিবেচনা করা দরকার। বাংলাদেশে প্রতি ৩ জন উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে ১ জন নিয়মিত চাকরি পান। এ কঠিন বাজারে টিকতে বিক্রয়-বিপণন, হিসাববিজ্ঞান ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন ব্যবসায় অল্প পুঁজিতে আয়ের পথ তৈরি সম্ভব।
মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিরাপদ পথ বেছে নিতে শেখায়। ‘ব্যবসায় লোকসান হলে লোকে কী বলবে’—এই ভয় তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বাধা দেয়। কিন্তু আর্থিক মুক্তির জন্য নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি নেওয়া দরকার। জ্যাক মা বা ইলন মাস্কের মতো সফল উদ্যোক্তারা ব্যর্থতা সত্ত্বেও হাল ছাড়েননি। কিয়োসাকি বলেন, ‘হারানো টাকা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু হারানো সময় নয়।’ তাই তরুণ বয়সে ছোট বিনিয়োগ বা ব্যবসায় ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। ব্যর্থতা পরাজয় নয়, বরং মূল্যবান শিক্ষা।
কিয়োসাকির ‘পুওর ড্যাড’ ছিলেন উচ্চশিক্ষিত সরকারি কর্মকর্তা, যিনি চাকরির স্থায়িত্ব ও পেনশনে বিশ্বাস করতেন। অন্যদিকে ‘রিচ ড্যাড’ ছিলেন উদ্যোক্তা।
আজ প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরে বসে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। দেশে তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ-ইকোনমিতে (রাইড শেয়ারিং, ডেলিভারি ইত্যাদি) প্রায় ১০ লাখ মানুষ যুক্ত। তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। এআই ও ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ খোলা।
বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ভোগ করছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ দশমিক ৮২ শতাংশ তরুণ (১৫-২৯ বছর), সংখ্যা ৪ কোটি ৫৯ লাখের বেশি। এই বিশাল শক্তি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে লাগালে অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটবে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে অ্যালায়েন্স ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন (আফি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাত বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক পদক্ষেপ।
১. আর্থিক বুদ্ধিমত্তা বাড়ানো: অর্থের মূল্য বুঝতে শেখা, অর্থনীতি ও বিনিয়োগবিষয়ক বই ও পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করা।
২. বাজেট করা: অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা রাখা। আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে করা। বিশেষ করে ‘৫০–৩০–২০’ নিয়ম (প্রয়োজন–ইচ্ছা–সঞ্চয়) অনুসরণ করা।
৩. নেটওয়ার্কিং: সফল ও ইতিবাচক মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। কারণ, চারপাশের মানুষের মানসিকতা নিজের ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।
৪. ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তুলে ধরা।
৫. ধৈর্য ও শৃঙ্খলা: রাতারাতি সফল হওয়ার ফাঁদ এড়িয়ে চলার অভ্যাস করা। আর্থিক স্বাধীনতা একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা; তাই পরিকল্পিত চেষ্টা ও ধৈর্য বজায় রেখে চলা।
পরিশেষে ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ কেবল একটি বই নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি আহ্বান। মনে রাখতে হবে, আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, বরং আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আগামী এক দশকে আপনি কোথায় থাকবেন। সুতরাং জ্ঞান ও আর্থিক বুদ্ধিমত্তাই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এম এম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক






