ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, দেশে সম্প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের পেছনে লোভ ও শক্তির লড়াই রয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবিক আন্দোলনের প্রয়োজন। তাঁর জীবনাদর্শে দেখানো আলোর পথই সংকট কাটাতে অনুসরণ করতে হবে।
আজ শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুই দিনের জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনের উদ্বোধনী সভায় এসব কথা বলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সম্মেলনের আয়োজক ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ’। প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে আজ তিনি এই ৪৪তম বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধন করেন।
সম্মেলনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোকে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, এই শক্তিগুলো মানুষের শাশ্বত সংস্কৃতি ও হাজার বছরের ঐতিহ্য ধ্বংস করতে চায়। তারা মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে ব্যগ্র। এই অন্ধকার থেকে রেহাই পেতে রবীন্দ্রনাথের আলোই আজ সবচেয়ে বেশি দরকার।
রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে নয়, তাঁর দর্শনের মাধ্যমে চেনার আহ্বান জানান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক সচেতনতা ধারণ করতে হবে। তিনি চেয়েছিলেন শোষণমুক্ত, মানবিক বিশ্ব গড়ে উঠুক, যেখানে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।
বর্তমান বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর প্রসার রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সভ্যতার এই সংকট আজও কাটেনি, বরং আরও ভয়াবহ হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ও মুক্তির সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব তুলে ধরেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের প্রেরণা দিয়েছে। আমাদের যে জাতীয় সংগীত, সেটিও রবীন্দ্রসংগীত। কাজেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।’ তাঁর বক্তব্যে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় রোধে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা ও বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজকে আক্রান্ত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক। তিনি বলেন, এসব থেকে বেরিয়ে আসতে সংস্কৃতিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। বাংলার সংস্কৃতি সর্বাংশে অসাম্প্রদায়িক, তাই এটি আঁকড়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলা করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সংগীতের গুরুত্ব তুলে ধরেন মফিদুল হক। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সংগীতকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করা, সমাজের দায়িত্ব ও অংশীদারিত্ব নিয়ে নিবিড়ভাবে ভাবতে হবে।
‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ গানের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরিষদের নির্বাহী সদস্য ত্রপা মজুমদার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন নির্বাহী সভাপতি বুলবুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম। পরিষদের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাঙালির সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন।
লিলি ইসলাম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের চেতনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। কিন্তু আমরা কেবল রবীন্দ্রসংগীতে সীমাবদ্ধ নই; বাঙালির যে বিশাল সংগীতের ঐশ্বর্য, তা লোকসংগীত হোক, নজরুলসংগীত হোক কিংবা পঞ্চকবির গান—সবকিছুকেই আমরা আমাদের অন্তরে লালন করি।’
সম্মেলন চলবে আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার। আজ সন্ধ্যা ছয়টায় প্রদীপ প্রজ্বালন, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, আবৃত্তি ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের কর্মসূচি রয়েছে। দেশজুড়ে সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। আজ চূড়ান্ত পর্বে ৫০ জন শিল্পী অংশ নেন সাধারণ ও কিশোর বিভাগে। বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হবে আগামীকাল। তখন প্যানেল আলোচনা, রবীন্দ্রপদক ও গুণীসম্মাননা, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান ও আবৃত্তির কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।






