বাংলাদেশের রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এখানে পৈতৃক সম্পদের ভিত্তিতে পুত্র-কন্যারা ক্ষমতায় আসে, যেন ‘পিতা ত্রাতাঃ; পিতা নেতাঃ, পিতাহি চরম নমস্যঃ’। নবাবের পর নবাবজাদা, সাহেবের পর সাহেবজাদি—এমন রাজনীতিতে ‘বাপের সম্পত্তি’ই বড় ব্যাপার। ‘পতির ক্ষমতায় সতীর ক্ষমতা’ এখানকার শেষ কথা।
রাজনৈতিক আসনে গাদাগাদি জাদা-জাদির উপস্থিতি এতটাই সুস্পষ্ট যে, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নবীন-প্রবীণদের গদিনশীন হওয়ার চেষ্টাকেও হেয় করে দেখা হয়।
পাল-সেন-সুলতানি-নবাবি আমল থেকে চলে আসা এই পরিবারতান্ত্রিক ধারা গিরিঙ্গিবাজ ফিরিঙ্গি শাসনেও থেমে যায়নি। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারি ব্যবস্থা শেষ হলেও উপমহাদেশের অভিজাত গণতন্ত্রে গণতন্ত্র পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপোষণের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। ফলে নেপোটিজমের সঙ্গে সহজেই সই পাতিয়ে নেপোদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ভারতে নেহরু বংশে মতিলালের ছেলে জওহরলাল, জওহরের মেয়ে ইন্দিরা, ইন্দিরার ছেলে রাজীব, রাজীবের ছেলে রাহুল। পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবারে জুলফিকারের মেয়ে বেনজির, বেনজিরের ছেলে বিলাওয়াল। এ দেশেও খান্দানি সিলসিলা অটুট। অনেক নেতার সন্তানরা হেসেখেলে নেতা হয়ে গেছে।
রাজনীতিতে জাদা-জাদির গাদাগাদি ছিল, আছে এবং থাকবে। আমরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও চেয়ার নিয়ে কাড়াকাড়ি মেনে নিয়েছি। তবে এবার মনে হচ্ছে, এই নেপোটিজম অন্য সব ঘাট ঘেঁটে শেষমেশ হেঁটে হেঁটে ক্রিকেটের সেটে ঢুকে সোজা বিসিবির চেয়ারে এঁটে বসেছে।
গত ৭ এপ্রিল বিসিবির আগের কমিটি ভেঙে চক চক করা আনকোরা অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুপুরে বিসিবি সভাপতির কেদারায় বসা আমিনুল ইসলামকে উঠিয়ে সন্ধ্যার আগেই অ্যাডহক কমিটির ১১ সদস্য নিয়ে বসেছেন নতুন সভাপতি তামিম ইকবাল। পদচ্যুত আমিনুল বলেছেন, তাঁর হক নষ্ট করে অ্যাডহক কমিটি করে ‘সাংবিধানিক ক্যু’ করা হয়েছে।
নতুন কমিটিতে অন্তত চারজন এমন যাঁদের ক্রিকেটের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা সাধারণ মানুষের অজানা। তবে পর্দার আড়ালে বিসিবি চালানো রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এদের মধ্যে তিনজনের বাপ-ছেলে এবং একজনের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক আছে। এরা হলেন বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ; অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু এবং শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী রাশনা ইমাম।
কষ্ট-কল্পনাবিলাসী কেউ কেউ কামনা করেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে নেপোটিজম থাকবে না; নেপোয় দই মারবে না; বাপের ক্ষমতায় ছেলের শাসন চলবে না। ইলেকশনে বড় দলের নমিনেশন ‘বাপের সম্পত্তি’ হবে না। অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন, দলের জন্য জেল-জরিমানায় জ্বলে খাক হওয়া খাঁটি ত্যাগী নেতারাই নেতৃত্ব ভোগ করবেন।
অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব তিন মাসের। এই সময়ে নির্বাচন করে নির্বাচিত কমিটি গঠন করতে হবে। তবে সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, তাঁদের ‘প্রথম এবং প্রধান’ কাজ হলো ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটের সুনাম ফিরিয়ে আনা’।
গত কয়েক মাসে আমিনুল ইসলামের কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিসিবির নামে বদনামই বেশি শোনা গেছে। এই অবস্থায় আরও বদনামের কায়দায় ফেলে রাখা উচিত নয়। তাই অ্যাডহক কমিটি সুনাম পুনরুদ্ধারের প্রকল্প নিয়েছে।
তবে দুর্নামের কালি মুছে ফেলা কঠিন। সুনাম ফেরাতে সময় লাগে, তিন মাসে আসে না, কয়েক বছর লাগে। তাই তামিমের টিমের মূল কাজ সুনাম ফেরানোর জন্য তিন মাসের বেশি থাকতে হবে। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নির্বাচিত হতে হবে। তামিম ইতিমধ্যে নির্বাচনের সম্মতি দিয়েছেন ক্রিকেটের সুনামের স্বার্থে। অন্য সদস্যরাও একইভাবে নির্বাচনে যাবেন বলে ধারণা।
নেতাদের সন্তান ও স্ত্রীর ক্রিকেট অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। সাবেক ক্রিকেটার আফতাব আহমেদ ফেসবুকে ভিডিওতে বলেছেন, ‘ভাই রে ভাই, যে পরিমাণ সার্কাস চলতেছে ক্রিকেট বোর্ডে, যদি দুই হাজার টাকা খরচ করেও টিকেট কিনেন, আপনার টিকেট বৃথা যাবে না।’
চায়ের দোকান থেকে সংসদে পর্যন্ত সমালোচনা। বিরোধী সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘এখন আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নাই। এটা এখন বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়ে গেছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা এই দেশের কৃতি ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি করেছি। আমরা এখানে কোনো বাপের দোয়া মায়ের দোয়া করি নাই।’
আমরা বংশগত রক্তের ভক্ত, তাই ইউপি থেকে এমপি নির্বাচনে পোষ্য কোটায় সিলেকশন হয়। ইউপি চেয়ারম্যান লিটু মিয়ার পর ছেলে টিটু মিয়া, তারপর ছেলে হিটু মিয়া—এমন বংশানুক্রমিক রাজনীতি আমরা মেনে নিই।
কষ্ট-কল্পনাবিলাসী কেউ কেউ কামনা করেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে নেপোটিজম থাকবে না; নেপোয় দই মারবে না; বাপের ক্ষমতায় ছেলের শাসন চলবে না। ইলেকশনে বড় দলের নমিনেশন ‘বাপের সম্পত্তি’ হবে না। অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন, দলের জন্য জেল-জরিমানায় জ্বলে খাক হওয়া খাঁটি ত্যাগী নেতারাই নেতৃত্ব ভোগ করবেন।
কিন্তু নতুন বাংলাদেশের পুরোনো নেতারা সেই আশা ভঙ্গ করেছেন। ‘নেতার ছেলে’ পরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠছে। এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বললেও বিপদ, তাই বিড়বিড় করে সহ্য করাই একমাত্র পথ।
সারফুদ্দিন আহমেদ মুক্তকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক
sarfuddin 2003 @gmail. com(মতামত লেখকের নিজস্ব)






