গাছের প্রতিটি শাখা থেকে নিচ পর্যন্ত পাতার ফাঁকে অসংখ্য সাদা ফুলের ভিড়। যেন শ্বেত বসনের কুমারীরা সদলবলে নাচতে নেমেছে। হাওয়ায় তাদের সাদা ওড়না উড়ছে। আকাশের নীলের সঙ্গে এই সাদা মিশে তৈরি হয়েছে অপূর্ব এক মায়া—যা শুধু চোখে দেখা যায়। এই শুভ্র ফুলের নাম কুর্চি।

আজ বুধবার সকালের ঝলমলে রোদে মৌলভীবাজার শহরের মনু নদের পাড়ে শান্তিবাগ ওয়াকওয়েতে সুগন্ধী কুর্চির দর্শন পাওয়া যায়। আগের রাতে ঝোড়ো বাতাস ও বৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতিতে জলের সতেজতা ও স্নিগ্ধতা এখনো লেগে আছে। এই ওয়াকওয়েতে অন্যান্য গাছেও নানা রঙের ফুল ফুটেছে। তবে এসবের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ে সরু দেহের কুর্চিগাছটি। গাছটিতে সবুজ পাতা ছাপিয়ে ফুলের উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফুলগাছটির সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথা এভাবে বলেছিলেন, ‘অনেক দিন পূর্বে শিলাইদহ থেকে কলকাতায় আসছিলাম। কুষ্টিয়া স্টেশন ঘরের পেছনে দেয়াল ঘেঁষা এক কুর্চিগাছ চোখে পড়ল। সমস্ত গাছটি ফুলের ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত। চারিদিকে হাটবাজার; একদিকে রেল লাইন, অন্যদিকে গরুর গাড়ির ভিড়, বাতাস ধুলায় নিবিড়। এমন অজায়গায় পি. ডব্লিউ. ডি-র স্বরচিত প্রাচীরের গায়ে ঠেস দিয়ে এই একটি কুর্চিগাছ তার সমস্ত শক্তিতে বসন্তের জয় ঘোষণা করছে—উপেক্ষিত বসন্তের প্রতি তার এ অভিবাদন সমস্ত হট্টগোলের ওপরে যাতে ছাড়িয়ে ওঠে এই যেন তার প্রাণপণ চেষ্টা। কুর্চির সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয়।’

কুর্চি সম্পর্কে নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গে’ বইতে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কুর্চি আবিষ্কারে কিছুটা বিস্ময় স্বাভাবিক। কেননা গাছটি আমাদের দেশজ এবং সংস্কৃতি কাব্যে বহুল উল্লিখিত। মেঘদূতের শুরুতেই বিরহী যক্ষ যে ফুলে মেঘপুঞ্জকে আহ্বান করেছে, তা তো কুর্চি।’

কুর্চির একটি দেশি নাম ‘গিরিমল্লিকা’। দ্বিজেন শর্মা জানিয়েছেন, পলাশ ও শিমুলের রং যখন ঝরে যায়, তরুর ভীরু সবুজ চৈত্রের রোষে সংকুচিত হয়ে আসে, কৃষ্ণচূড়ার কলিরা শাখার গভীরে ঘুমিয়ে থাকে। তখন কুর্চিই কেবল প্রকৃতির বর্ণ-সুষমার ঘোষক হয়ে ওঠে। নিষ্পত্র শাখায় সাদা ফুলের অবারিত প্রাচুর্য এবং দূরবাহী মধুগন্ধে সে বসন্তের জয় ঘোষণা করে। এই গাছের আদি আবাস বাংলা, ভারত ও ব্রহ্মদেশ।

কুর্চির কাণ্ড সরল, উন্নত এবং শীর্ষ অজস্র ঊর্ধ্বমুখী শাখায় ডিম্বাকৃতি, কখনো বা এলোমেলো থাকে। বাকল অমসৃণ, হালকা ধূসর। শীতের শেষে গাছটি নিষ্পত্র হয়ে পড়ে। বসন্তের শেষে এ শূন্যতা কাটিয়ে ভরে ওঠে কচি পাতার সবুজে। কুর্চির স্বাভাবিক উচ্চতা ১০ থেকে ২০ ফুট। গাছটিতে সারা বর্ষা ধরে কয়েকবার ফুল ফুটে থাকে। ফুল রঙ্গনাকৃতির, অর্থাৎ নিচের অংশ নলাকৃতি এবং ওপরের মুক্ত পাপড়িতে ছড়ানো। পাঁচটি পাপড়ির মুক্ত অংশ ঈষৎ বাঁকানো, বর্ণ দুধসাদা এবং সুগন্ধ তীব্র, মধুর।

কুর্চি ভেষজ মূল্যে সমৃদ্ধ। ফুল, বাকল, ফল সবই আমাশয়ের ওষুধ। তদুপরি বাকল চর্মরোগ ও প্লীহায়, ফুল রক্তদোষে, পাতা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, বাত ফোঁড়া ও ক্ষতে এবং বীজ অর্শ, অ্যাজমা, শূল-বেদনা ও জ্বরে উপকারী।

কুর্চিগাছ শহর সাজানোতে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। মৌলভীবাজারের শান্তিবাগ ওয়াকওয়েতে আরও একটি কুর্চিগাছ আছে—সেখানেও বেশ কিছু ফুল ফুটেছে। গাছ দুটোর কাছে গেলেই আশপাশের সুগন্ধ টের পাওয়া যায়।