ঈদের আলোচিত সিনেমা-সিরিজগুলো দেখে থাকলে আরেফিন জিলানীর অভিনয় নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে। নামটা অচেনা লাগলেও চরিত্রগুলো হয়তো মনে আছে। ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর বোকাসোকা তরুণ ফয়সাল, ‘চক্র ২’-এর সাংবাদিক—এই তরুণ অভিনেতার যাত্রার গল্প তুলে ধরছেন লতিফুল হক।
মোটা জ্যাকেট, ভারী বুট, কালো টুপি মাথায়, মুখে ক্রূর হাসি। কথা কম বললেও শীতল দৃষ্টিতেই ভয় ধরিয়ে দেয়। স্নাইপার রাইফেল নিয়ে সমুদ্র থেকে পাহাড়ে ছোটে, কান খোলা রেখে নির্ভুল নিশানা নেয়।
ঈদে চরকিতে মুক্তি পাওয়া শিহাব শাহীনের সিরিজ ‘ক্যাকটাস’-এ এমনভাবেই দর্শককে আতঙ্কিত করেছেন আরেফিন জিলানী। দেশের সিনেমা-সিরিজে এমন গুপ্তঘাতকের চরিত্র আগে দেখা যায়নি। কোনো পুরনো রেফারেন্স ছাড়াই নিজের চেষ্টায় চরিত্রে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। এক দুপুরে ফোনে কথা বলতে গিয়ে উঠে এল তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি।
চাকরি নাকি অভিনয়
স্কুল-কলেজ জীবন থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন জিলানী। ভালো কণ্ঠস্বরের জন্য আবৃত্তি, নাটক, বই পড়ায় শিক্ষকরা সুযোগ দিতেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ও ক্লাব কার্যক্রমে অংশ নিতেন।
দ্বিতীয় বর্ষে জানতে পারেন, একটি এফএম রেডিওতে আরজে নেওয়া হবে। এভাবে সিটি এফএম-এ যোগ দেন, পরে রেডিও দিনরাতে কাজ শুরু করেন। সময়টা ২০১৫-১৬। ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের টান অনুভব করতেন। রেডিওর কাজে সেই আকর্ষণ আরও তীব্র হয়। তাই প্র্যাচ্যনাট অ্যাক্টিং স্কুলের ৩৩তম ব্যাচে ভর্তি হন।
‘ওখানে ভয়েস অ্যাক্টিংসহ অভিনয়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়া শিখতে শিখতে মনে হয়, আমাকে অভিনয়টাই করতে হবে,’ বলছিলেন জিলানী।
২০১৯ সালে গোলাম সোহরাব দোদুলের ‘সাপলুডু’ সিনেমায় সুযোগ পান। মাত্র তিন-চার মিনিটের ভূমিকা। নায়ক আরিফিন শুভর বিকল্প হিসেবে দরকার হয়। উচ্চতা, কাঠামো—সব মিলে যায়। ছবিতে ওপর থেকে পানিতে লাফ দেওয়ার স্টান্ট নিজেই করেন। কিন্তু এই সাহসী শুরুর পর চ্যালেঞ্জ এল কোভিডকালে। কাজ নেই, চাকরিও করেননি। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে মা-বাবার প্রত্যাশা বুঝতেন। তাই ২০২১ সালে এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি নেন।
টুকটাক অভিনয়ের সুযোগে অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করতেন। কিন্তু বড় কাজে ১২ দিন ছুটি লাগলে অফিস মানে না। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বলেন সব। স্ত্রী জানতেন তার বিষণ্ণতা। বললেন, চাকরি ছাড়ো। মা আপত্তি করলেও জিলানী সিদ্ধান্ত নেন স্বপ্নের পথে এগোবেন। চাকরি ছাড়লেন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের ২৯ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
তখন ওজন ১১৮ কেজি। টাকায় জিমে ভর্তি হন, নিজেকে গড়তে শুরু করেন। ‘আমি আসলে এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। আমার পরিবারের কেউ অভিনয়ে নেই, মিডিয়ায়ও পরিচিত কেউ নেই। আগে নিজেকে ফিট করেছি, সঠিক ডায়েট করেছি। ইন্টারনেট ঘেঁটে, বই পড়ে নিজেকে চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি করেছি। চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই ওজন ১১৮ থেকে ৮৯-এ নিয়ে এসেছিলাম,’ বলছিলেন জিলানী।
বাঁকবদলের গল্প
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় প্রথম বড় কাজ ‘শিউলিমালা’। দীপ্ত টিভির ধারাবাহিকে কাজ করে অনেক শিখেছেন বলে মনে করেন জিলানী।
তাঁর ভাষ্যে, ‘অনেকে সিরিয়ালকে ছোট করে দেখেন। কিন্তু সিরিয়াল হচ্ছে সব মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে কষ্টের মাধ্যম। দিনে আপনার ১৪ থেকে ১৬টি দৃশ্য করতে হয়। আমি তো ২০টাও করেছি। ভুল করার সুযোগ নেই, নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ করতে হয়। এটা করতে গিয়েই আমার মনে হয়েছে, সঠিক পথে আছি।’
পরিচিতি পান গত বছরের তানিম নূরের উৎসব সিনেমা ‘মোবারক’ চরিত্রে। বাণিজ্যিক সাফল্য এই ছবিটি তাঁর ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছে।
স্নাইপার চরিত্রের প্রস্তুতি জানতে চাইলে বললেন, ‘বই পড়ে আর সিনেমা দেখে।’ অভিনয়ে স্তানিস্লাভস্কির সিস্টেম অনুসরণ করেন (রুশ নাট্যব্যক্তিত্ব কনস্তান্তিন স্তানিস্লাভস্কির অভিনয়পদ্ধতি, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাস্তববাদী অভিনয়ের ভিত্তি স্থাপন করে)। নির্মাতার পরামর্শ নেন, চিত্রনাট্য পড়েন, ইন্টারনেট খুঁজেন।
ছোটবেলায় ‘সংঘর্ষ’-এ আশুতোষ রানার অভিনয় ভয় ধরিয়েছিল, আবার দেখেছেন। ‘মার্ডার ২’-এর প্রশান্ত নারায়ণনও প্রভাব ফেলেছেন। নেটফ্লিক্সের সিনেমা দেখে নিজের কল্পনায় স্নাইপার গড়ে তুলেছেন। ‘ক্যাকটাস’-এর স্নাইপার থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর ফয়সাল সম্পূর্ণ উল্টো।
বোকাসোকা ফয়সালের জন্য চিত্রনাট্যের পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ও নাটক দেখেছেন। প্রেরণা প্রয়াত আবদুল কাদের। ‘আমার কাছে মনে হয়েছিল, ফয়সালের সঙ্গে আবদুল কাদের স্যারের অভিনীত চরিত্রগুলোর একটু মিল আছে। সিরিয়াস মুহূর্তে পর্দায় উনি এমন সব কাণ্ডকীর্তি করতেন, পরিবেশটাই বদলে যেত,’ বলছিলেন জিলানী।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘চক্র ২’–এর শুটিং একই সময়। বোকাসোকা থেকে সিরিয়াস সাংবাদিক রাহাতে যাওয়া কঠিন। তাই ভারতীয় অভিনেতা-কোচ সৌরভ সচদেবের কাছে অনলাইন কোর্স করেন। ‘আমি নিজের চরিত্র, তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের সঙ্গে প্রচুর কথা বলেছি। বলেছি, একদিন বোকা চরিত্র থেকে বেরিয়ে পরদিন কীভাবে সিরিয়াস চরিত্রে ঢুকব? তাঁরা অনেক পরামর্শ দিয়েছেন, কিছু ব্যায়াম, কিছু নিয়ম মানার কথা বলেছেন। এর মধ্যে একটা ছিল মজার—লম্বা সময় ধরে গোসল। মনকে বোঝানো, একটা চরিত্রকে আমি শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলছি।’
সামনে কী
চাকরি ছেড়ে অভিনয়ে এসেছেন, সাম্প্রতিক সাফল্যে খুশি। ‘ফেল করতে পারতাম, সামনেও হয়তো করতে পারি, কিন্তু এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ,’ বললেন তিনি। পবিত্র ঈদুল আজহায় নতুন সিরিজ ‘কালো বিড়াল’ আসছে, আরও কাজ চলছে। শেষে স্ত্রী সংগীতশিল্পী ফাতিমা তুয যাহরা ঐশীকে ধন্যবাদ। সব সময় পাশে ছিলেন সঙ্গী।






