বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয় বাদে দেশের অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে ক্লাস চলবে। অর্থাৎ সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন অফলাইন শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হবে, যতক্ষণ না জ্বালানিসংকট কেটে যায়। এই সংকট উন্নয়নশীল, অনুন্নত এবং উন্নত সব দেশেই দ্রুত প্রভাব ফেলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে জ্বালানিসংকট বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও এর প্রকট ছায়া পড়েছে।

জ্বালানিসংকটকালে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও খরচ কমানোর জন্য সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিশ্র পদ্ধতিতে ক্লাসের কথা ভাবছে। কোভিড মহামারিতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব চরম পরিস্থিতিতে তারা শ্রেণিকক্ষে মন দিতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অসীম সাহস ও ত্যাগ অস্বীকার করা যায় না। তাই সেই ত্যাগ বিবেচনায় তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাবলিক পরীক্ষায় সিলেবাস কমানোসহ শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন ছাড় দিয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথমদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মাসব্যাপী রমজানের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব পড়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার (প্রথম পর্যায়ে ১০ সপ্তাহ) ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। এর সাময়িক সমাধান এবং দিনের আলোর পূর্ণ ব্যবহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার সপ্তাহে তিন দিন মিশ্র পদ্ধতিতে পাঠদানের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলা থাকবে।

এই মিশ্র পদ্ধতির প্রস্তাব আনার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নিয়েছে বলে সংবাদপত্রে জানা গেছে। ব্লেন্ডেড পদ্ধতির যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হচ্ছে, কোভিডকালে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা মোটামুটি অভ্যস্ত হয়েছে। তাই এই পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম চালালে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং জ্বালানিসংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

কিন্তু আমাদের আশঙ্কা অন্যদিকে। এই মিশ্র পদ্ধতি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল, উপকূলীয় এবং হাওরের স্কুলের শিক্ষার্থীরা, যাদের অভিভাবকদের হাতে স্মার্টফোন নেই, সাধারণ বাটন ফোনও নেই। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ না পৌঁছানো স্থানে স্মার্টফোন বা অনলাইন ক্লাস অভিভাবকদের কাছে বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। তদুপরি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ভাষাগত সমস্যা আছে। সরকারের প্রস্তাবে বলা আছে, শিক্ষার্থীরা বাড়িতে অনলাইন ক্লাস করলেও শিক্ষকদের সপ্তাহে ছয় দিন স্কুলে সশরীরে থাকতে হবে।

লক্ষণীয়, পাহাড় বা হাওরের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই। সেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় অবাস্তব। যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ আছে, সেখানে মাসিক বিল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। অন্যদিকে সরকারি বড় অফিস-আদালতগুলো আধুনিক ভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। যেমন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট—কোনো দৃশ্যমান কাজ নেই, তবু সম্পূর্ণ এসি-চালিত, মাসিক বিদ্যুৎ বিল তিন থেকে চার লাখ টাকা।

তাই আমরা মনে করি, এসব কর্মহীন বড় অফিসগুলো কৃচ্ছ্রসাধনে এনে দূরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলোর পাঠদান চলমান পদ্ধতিতে রাখা হোক। মিশ্র পদ্ধতি শুধু বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা সদরের প্রতিষ্ঠানে আনা হোক। একই সঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয় অফলাইন না করে অনলাইনে আনা হোক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোন থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে এলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় বাড়বে। শিশুদের মানসিক চাপ না বাড়িয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে শিক্ষাদান চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। ঢাকায় প্রতি বাচ্চার পেছনে দৈনিক জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণ করা হোক। কিন্তু জ্বালানি সাশ্রয়ের নামে গ্রামের প্রান্তিক শিশুদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত করা যৌক্তিক নয়।

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে সচেতন ও কঠোর, অতীতে নকল বন্ধে তাঁর ভূমিকা আমরা জানি। তাই বিশ্বাস, তিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন।

আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারে সেজন্য আগাম প্রস্তুতি জরুরি। কোভিডকালে ছোট শিক্ষার্থীরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের আর চ্যালেঞ্জ না দিয়ে বিকল্প সমাধান খুঁজতে হবে।

  • ইলিরা দেওয়ান কমিশনার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

    মতামত লেখকের নিজস্ব