সংস্কার একটি ধীরগতির চলমান প্রক্রিয়া, যা যথাযথ পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়। বিভিন্ন উন্নত দেশের উন্নয়ন ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, তাদের রাজনৈতিক সংস্কার সময়ের চাহিদা অনুসারে সংগঠিতভাবে গড়ে উঠেছে। সেখানে রাজনৈতিক মতভেদকে সংস্কারকে আরও তীক্ষ্ণ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, কেবল সস্তা বিরোধের জন্য নয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংস্কার আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াকে অন্তর্বর্তী সরকার যখন একটি ‘বাজ-ওয়ার্ড’ (অতি চর্চিত বিষয়) বানিয়ে ফেলেছিল, তখন আমরা আশা করেছিলাম নতুন নির্বাচিত সরকার এর ন্যায়সঙ্গততা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ, পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়ে একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে। কোনো তাড়াহুড়ো যেন এই অধরা সংস্কারকে অধরাই না রেখে দেয়।
সংস্কার বিষয়ে বিএনপির বেশ কিছু নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, যা একটি যুক্তিযুক্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নোট অব ডিসেন্ট মানে সেই বিষয়গুলো পুরোপুরি বাতিল করা নয়, বরং ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য দরজা খোলা রাখা। এটি করলে আমরা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক ধাপ এগিয়ে যাব।
এই ‘হতাশা’র সময়ে আমরা কী করব। নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসায় গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরেছে বলে আত্মতৃপ্তিতে ভোগলে আমরা বড় ভুল করব। কারণ, দীর্ঘ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে বিগত প্রায় দুই দশকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছি। এর প্রভাব রাজনীতি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট।
এখন সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরের পর সংস্কারে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখা যায়নি। সেই সরকারের অনেকে মনে করতেন তারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং সব ম্যান্ডেট পেয়েছেন, যা নিয়ে নাগরিক সমাজে বিতর্ক হয়েছে এবং জনমনে দ্বিধা জন্মেছে।
বিগত সময়ে আমাদের গবেষণা ও লেখার স্বাধীনতাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কীভাবে হতো সেটা এখন সবাই জানে, কিন্তু সেই সময় এ নিয়ে কথা বলা ছিল ভয়ের, বিশেষ করে বলতে হয় গুমের ভয়। যে ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছিল সেই ভয়ের সংস্কৃতিতে আমরা আর ফিরে যেতে চাই না।
সেই দ্বিধা কাটিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, এটি তাদের যা খুশি তাই করার ম্যান্ডেট দেয়নি। নির্বাচনের পরপরই লিখেছিলাম, ভূমিধস বিজয় মানে সবকিছু পেয়ে যাওয়া নয়। বিরোধী দলকে শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভূমিকায় থাকতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক না থাকলে সংসদীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, যা কাম্য নয়।
বিগতকালে বিরোধী দলকে শুধু সরকারবিরোধী হিসেবে দেখেছি—বয়কট, অনাস্থা, সংসদ থেকে ওয়াকআউট। ফলে সংসদ অচল হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো ঝুঁকিতে পড়েছে। তাই বিএনপিকে সচেতন থাকতে হবে—বিরোধী দলের অধিকার সংসদে নিশ্চিত করা এবং সংস্কারে ইতিবাচক থাকা।
অধ্যাদেশ: সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু করা নয়। সংস্কারে বিএনপিকে পরিষ্কার অবস্থান নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তথ্যের ঘাটতি বা অস্পষ্টতা থাকলে বিরোধী দল (জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট) তাদের সংস্কার-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কিছু বিরোধী এমপির মুখে এটি শোনা যাচ্ছে, যা বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার-জামায়াত-এনসিপি জোটের টানাপোড়েন দৃশ্যমান। এ থেকে জনগণ মনে করতে পারে বিএনপি সংস্কার থেকে দূরে রয়েছে, যা তাদের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করবে।
সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ নিয়ে বিতর্ক জনমনে সংশয় জন্মাচ্ছে, যা বিএনপিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অবিকল রাখা হচ্ছে, ২০টি চলতি অধিবেশনে উপস্থাপিত হবে না এবং আরও যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম-নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর নিয়ে বিতর্ক চলছে।
দেশগঠনে বিএনপির ইতিবাচক ভূমিকার জন্য সংস্কারে বিশদ কর্মপরিকল্পনা পরিষ্কার করতে হবে। গুমের বিষয় সবচেয়ে সংবেদনশীল, যা উপেক্ষা করা যায় না। গুমের নেতিবাচক প্রভাব অনেকের জীবন বদলে দিয়েছে।
বিগত সময়ে আমাদের গবেষণা ও লেখার স্বাধীনতাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কীভাবে হতো সেটা এখন সবাই জানে, কিন্তু সেই সময় এ নিয়ে কথা বলা ছিল ভয়ের, বিশেষ করে বলতে হয় গুমের ভয়। যে ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছিল সেই ভয়ের সংস্কৃতিতে আমরা আর ফিরে যেতে চাই না।
গুম মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাই সরকারের সিদ্ধান্ত যেন গুম-খুন-নিখোঁজের সুযোগ না করে। বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে অসংখ্য নেতা-কর্মী এর শিকার হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনও গুরুত্বপূর্ণ। বিগতকালে দুর্নীতির আকাশচুম্বী বিস্তার দেখা গেছে, বিলিয়ন ডলার পাচার, মেগা প্রজেক্টে দুর্নীতির মহোৎসব।
এসব অধ্যাদেশ এখনই সংসদে না তুলে সংস্কারের পরিকল্পনা জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। না হলে সরকারের ভূমিকায় দ্বিধা তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় অর্জন জনগণের আস্থা অর্জন। জনবান্ধব নীতি ও আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি অধিকাংশ সংস্কার সংসদীয় পথে নিচ্ছে, তাই অল্প অধ্যাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত যেন সেগুলো ব্যর্থ না করে। দেশগঠনের এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে, আওয়ামী লীগের ভুল না করে।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব






