ফুটবলে গোলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রক্ষণাবেক্ষণ বা মিডফিল্ডে যাই করুন না কেন। গোলদাতাদেরই সাধারণত সবাই মনে রাখে। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল প্রথম লেগের গতকাল রাতের দুই ম্যাচ দেখে এই ধারণা যেন উড়ে গেছে।
লিসবনে স্পোর্তিংকে ১-০ গোলে হারিয়েছে আর্সেনাল। আর মাদ্রিদে রিয়াল মাদ্রিদকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছে বায়ার্ন মিউনিখ। স্বাভাবিকভাবেই গোলদাতারাই ম্যাচসেরা হবেন বলে মনে হতো। কিন্তু না, গোল ঠেকানোর কাজে দুর্দান্ত হয়েছেন তাঁরাই—সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ম্যানুয়েল নয়্যার এবং লিসবনে ডেভিড রায়া।
বায়ার্নের পোস্টে নয়্যার এবং আর্সেনালের পোস্টে রায়া দাঁড়িয়ে ছিলেন অটল দেয়ালের মতো। তাদের ছাড়া প্রতিপক্ষের আক্রমণ বারবার সফল হলে ম্যাচের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।
নয়্যারের কথা বলা যাক। ৪০ বছর বয়সেও পোস্টের নিচে তিনি যেন চিরযুবা। কাল রাতে বার্নাব্যুতে শেষ বাঁশি বাজার পর রিয়ালের ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার বলেছেন, “আজ (কাল) রাতে বায়ার্নের সেরা খেলোয়াড় ম্যানুয়েল নয়্যার।” এতে সায় দিয়েছেন রিয়ালের গোলকিপার আন্দ্রেয়া লুনিনও। কারণ, নয়্যার ৯টি সেভ করেছেন। এর মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের তিনটি করে শট ঠেকিয়েছেন।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত পাঁচ মৌসুমে এক ম্যাচে এটাই নয়্যারের সর্বোচ্চ সেভ। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউটে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি সেভ করেছিলেন ২০১৭ সালের এপ্রিলে—১০টি সেভ, রিয়ালের বিপক্ষেই!
এমন পারফরম্যান্সের পর বায়ার্নের কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে প্রশংসা আসাই স্বাভাবিক। সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, নয়্যারকে তিনি সর্বকালের সেরা গোলকিপার মনে করেন কি না? কোম্পানির উত্তর, “আপনারা তো আমাকে থিবো কোর্তোয়ার মতো খেলোয়াড়দের বিরাগভাজন করবেন ওকে আমি খুব পছন্দ করি।”
চোট থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেননি এখনো রিয়ালের গোলকিপার কোর্তোয়া, যিনি কোম্পানির একসময়ের বেলজিয়াম জাতীয় দলের সতীর্থ। তবু নয়্যারকে প্রশংসা করে কোম্পানি বলেন, “সবারই নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে। তবে ম্যানু (নয়্যার) দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সেরা ফর্ম ধরে রেখেছে। খুব কম গোলকিপারই এটা করতে পারেন। আমি প্রতিদিন অনুশীলনে ওকে দেখি এবং এখনো সমানভাবে মুগ্ধ হই। এটি প্রমাণ করে যে বিশ্বসেরা গোলরক্ষকদের একজন হয়ে থাকার সামর্থ্য তার কতটা প্রবল...সে যদি সেরা খেলোয়াড় হয়, তবে আমি খুশি এতে কোনো সমস্যা নেই। এই পর্যায়ের ম্যাচে এমন বড় পারফরম্যান্সেরই প্রয়োজন হয়।”
নয়্যার নিজেও বলেছেন, “রিয়াল ধারাবাহিক হুমকি হয়ে ওঠায় আমাকে আজ (কাল) রাতে নিজের সেরাটা দেখাতে হয়েছে।”
জার্মান কিংবদন্তির জ্বলে ওঠার রাতেই আর্সেনালের স্প্যানিশ গোলকিপার ডেভিড রায়াও নিজের সেরাটা দেখিয়েছেন। ম্যাচের গোলদাতা কাই হাভার্টজ তাঁকে “বিশ্বের সেরা গোলকিপার” বলেছেন। ৩০ বছর বয়সী রায়া ছোটখাটো মিলিয়ে বেশ কয়েকটি সেভ করেন, যার মধ্যে চারটি একেবারে অসাধারণ।
চলতি মৌসুমে ৪১ ম্যাচে ২২টিতে ‘ক্লিন শিট’ রেখেছেন রায়া—যা ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে এই মৌসুমের সবচেয়ে বেশি। লিসবনেও দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখা গেছে।
কারাবাও কাপ ফাইনাল ও এফএ কাপ কোয়ার্টার ফাইনালে হারের পর কেপা আরিজাবালাগার উপর ভরসা করেছিলেন আর্সেনাল কোচ মিকেল আরতেতা। কিন্তু দুটি ম্যাচেই ভুল করায় কেপাকে বাদ দিয়ে রায়াকে খেলান তিনি। রায়া প্রমাণ করলেন, তিনিই আর্সেনালের নাম্বার ওয়ান।
জয়ের পর আমাজন প্রাইমে হাভার্টজ রায়া নিয়ে বলেন, “অবিশ্বাস্য। আমার মনে হয় ফুটবল বিশ্বে তাকে এখনো সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। কিন্তু গত দুই মৌসুমে আমার চোখে সে–ই বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক। সে অনেকবারই আমাদের রক্ষা করেছে। তাকে দলে পেয়ে আমরা আনন্দিত।”
চ্যাম্পিয়নস লিগের চলতি মৌসুমে আর্সেনাল ও রায়ার এটি সপ্তম ‘ক্লিন শিট’—সব দল ও গোলকিপার মিলিয়ে সর্বোচ্চ। প্রিমিয়ার লিগে এ মৌসুমে ৩১ ম্যাচে ১৫ ‘ক্লিন শিট’—লিগে সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ইউরোপের ময়দানে এ মৌসুমে ৯০ শতাংশ শট (৩০টির মধ্যে ২৭টি) ঠেকিয়েছেন রায়া—চ্যাম্পিয়নস লিগে টিকে থাকা অন্য গোলকিপারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গতকাল রাতের পারফরম্যান্সের পর আমাজন প্রাইমকে রায়া বলেন, “আমি তো এই কাজের জন্যই পোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছি। এটা (ক্লিন শিট) নিয়ে আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ, গোল হজম না করলে ম্যাচ জেতা অনেক সহজ হয়ে যায়।”
রিয়ালকে হারিয়ে সেমিফাইনালে এগিয়েছে বায়ার্ন। শেষ মুহূর্তের গোলে স্পোর্তিংকে হারিয়েছে আর্সেনাল। বায়ার্ন জানে খেলা এখনো শেষ হয়নি, রিয়ালও বলছে খেলা হবে।






