স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে কিছুটা বেশি অকটেন সরবরাহ করলেও ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেকে রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত কেনাকাটা শুরু হয়েছে, যা ঠেকানো যায়নি। ফলে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং এটি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে কে কখন কত তেল নিচ্ছে তার তথ্য থাকবে। এতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও মজুত রোধ করা সম্ভব। সরকার এই দিকেই এগোচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল মঙ্গলবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "জ্বালানি তেল মজুত করার প্রবণতায় অনেকে বাড়তি কিনছেন। জেলা পর্যায়ে ফুয়েল কার্ড চালু করে ভিড় কমানো হয়েছে। ঢাকাতেও শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।"

বিপিসি সূত্র বলছে, ৬ এপ্রিলের হিসাবে দেশে ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২২৮ টন। পেট্রলের মজুত আছে ১৬ হাজার ৩০ টন এবং অকটেনের মজুত আছে ১০ হাজার ৫২৬ টন। মন্ত্রী জানিয়েছেন, কোন জ্বালানির মজুত কত তা জানা আছে এবং প্রয়োজনে আগামী মাস থেকে দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। মার্চ থেকে আতঙ্কের কেনাকাটা শুরু হয়। তখন সরকার গত বছরের সরবরাহের পরিমাণ দেখিয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ করে। বিপিসি সূত্র বলছে, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত মার্চে দিনে গড়ে ডিজেল সরবরাহ কমেছে ১০ শতাংশ, পেট্রল সরবরাহ কমেছে ১৫ শতাংশ। তবে অকটেন সরবরাহ বেড়েছে ২ শতাংশ। দিনে গড়ে ২৯ টন বেশি অকটেন বিক্রি হয়েছে।

এবার মার্চে দিনে গড়ে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭১ টন। এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭০ টন। মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২২২ টন। তবে এপ্রিলে কিছুটা কমিয়ে দিনে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১১৪ টন। আগামী সপ্তাহে সরবরাহ বাড়তে পারে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পেট্রল ও অকটেনের ঘাটতির শঙ্কা নেই। তাই সরবরাহ আরও বাড়ানো যেতে পারে এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিলিয়ে দাম বাড়ানো উচিত।

জ্বালানি তেল মজুত করার প্রবণতায় অনেকে বাড়তি কিনছেন। জেলা পর্যায়ে ফুয়েল কার্ড চালু করে ভিড় কমানো হয়েছে। ঢাকাতেও শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে
ইকবাল হাসান মাহমুদ, জ্বালানিমন্ত্রী

উত্তরার একটি পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে ১৮ হাজার লিটার অকটেন নেন তিনি। বেলা তিনটায় বিক্রি শুরু করলে সাতটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। আগে সারা দিনেও এ পরিমাণ তেল বিক্রি করা যেত না। এত তেল কোথায় যাচ্ছে, বুঝতে পারছেন না। তবে সোমবার তিনি কয়েকজন মোটরসাইকেলচালককে শনাক্ত করেছেন, যাঁরা টানা তিন দিন ধরে তেল নিচ্ছেন। মোহাম্মদপুর এলাকার একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক বলেন, তেল নিয়ে বাইরে বিক্রি না করলে এত চাহিদা হওয়ার কথা নয়।

বিপিসি সূত্র বলছে, ৬ এপ্রিলের হিসাবে দেশে ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২২৮ টন। পেট্রলের মজুত আছে ১৬ হাজার ৩০ টন এবং অকটেনের মজুত আছে ১০ হাজার ৫২৬ টন। পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। অকটেনের চাহিদার ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়। আজ বুধবার রাতে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এ মাসে ডিজেল নিয়েও কয়েকটি জাহাজ আসার কথা। তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে কোনো পাম্প সপ্তাহে এক দিন তেল নিত, এখন ৭ দিন তেল নিচ্ছে তারা।

যুদ্ধ না থামলে মানুষের ভীতি কাটবে না। বাড়তি কেনার প্রবণতাও অব্যাহত থাকবে। তবে যথাযথ রেশনিং ও তেল বিক্রির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা তৈরি করা গেলে জ্বালানিসংকট কমানো যেত। এ ক্ষেত্রে কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাড়তি তেল কেনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ম তামিম, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ

পেট্রলপাম্পের মালিকদের অভিযোগ, কোনো পাম্প বেশি তেল পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে কম। পদ্মা তেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গত বছর কোন পাম্প কত তেল নিয়েছে, সেই তথ্য কোম্পানির কাছে আছে। সেটির ওপর ভিত্তি করে বর্তমান চাহিদা মূল্যায়ন করে তেল সরবরাহ করা হয়। কারও ক্ষেত্রে বৈষম্যের সুযোগ নেই।

দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসন আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছে। কোনো কোনো জেলায় ফুয়েল কার্ড চালু করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফিলিং স্টেশনে ভিড় কমাতে শ্রীলঙ্কার কিউআর কোড মডেল পথ দেখাতে পারে। জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যুদ্ধ না থামলে মানুষের ভীতি কাটবে না। বাড়তি কেনার প্রবণতাও অব্যাহত থাকবে। তবে যথাযথ রেশনিং ও তেল বিক্রির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা তৈরি করা গেলে জ্বালানিসংকট কমানো যেত। এ ক্ষেত্রে কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাড়তি তেল কেনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

‘অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি’