পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকার আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, আগামী পরীক্ষায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হতে পারে। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে বরিশাল অঞ্চলের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ দমনে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ উদ্দেশ্যে পাবলিক পরীক্ষা আইন, ১৯৮০ সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয়েছে এবং শীঘ্রই জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে পাবলিক পরীক্ষার সংজ্ঞা সম্প্রসারিত হবে। শুধু শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নয়, ব্যাংক ও বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাও এর আওতায় পরিচালিত হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকল প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এহছানুল হক বলেন, এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কেউ নকল করে পার পেতে না পারে। এ জন্য পরীক্ষা হলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সিসি ক্যামেরা যাতে বিদ্যুৎ নেই এমন অজুহাতে বন্ধ না রাখতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনে আইপিএস সংযোজন করা হবে। একই সঙ্গে পাঠদান কক্ষে শিক্ষকেরা যাতে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তা–ও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে চলা প্রচারণা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমি ফেসবুকে অনেক মেসেজ (বার্তা) পাচ্ছি পরীক্ষা পেছানোর জন্য। শিক্ষার্থীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বিগত সময়ে খাতায় লিখলেও পাস, না লিখলেও পাস—এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। এখন যোগ্যতার ভিত্তিতেই ফলাফল নির্ধারণ হবে। গত বছর পরীক্ষা যেভাবে নিয়মের মধ্যে হয়েছে, এবারও সেই একই নিয়মের মধ্যে হবে। তাই শিক্ষার্থীরা বুঝে গেছে পরীক্ষায় আর নকল করা যাবে না। যেহেতু নকল করা যাবে না, তাই তারা এখন পড়াশোনা করেই পরীক্ষার হলে আসবে। এই বার্তা তারা পেয়ে গেছে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

বিএনপি সরকারকে শিক্ষাবান্ধব সরকার বলে উল্লেখ করেন এহছানুল হক মিলন। গুণগত শিক্ষা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারে এসে সেটা প্রমাণ করেছিল। এবারও সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। আমাদের ইচ্ছা এ দেশের শিক্ষাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমার শুধু দাপ্তরিক কাজের জায়গা নয়, উপসনালয়। আর শিক্ষকেরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আপনাদেরও সেই দায়িত্ব নিতে হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোর কথাও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের শিক্ষা খাতে আগে জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন।

গত সরকারের আমলে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রশ্ন বিক্রির মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। এ ধরনের শাস্তিহীনতা শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুই শর বেশি উন্নয়ন প্রকল্প করেছে। সেগুলো দিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি করে টাকা পাচার করা হয়েছে। এখন আর সেই সুযোগ নেই। প্রতিটি বিষয়ের তদন্ত করা হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার গুণগত মান ফিরিয়ে আনা হবে।

শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী করতে বিদ্যালয়গুলোতে একদিন অফলাইন, একদিন অনলাইন পাঠদান পদ্ধতি চালু করা যায় কি না, এ বিষয়ে ভাবার পরামর্শ দেন শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ তহবিল নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২২ সাল থেকে অনেক শিক্ষক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আগামী বাজেটের পর ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেযারম্যান মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম, বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বরিশাল জেলা পরিষদ প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান প্রমুখ।

শিক্ষামন্ত্রী সভা শেষে বিকেলে বরিশাল সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।