জ্বালানি যেকোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাস্তবে, বিশ্বের সব দেশই জ্বালানি সম্পদে সমানভাবে সমৃদ্ধ নয়। সম্পদের ভান্ডারের ভিত্তিতে দেশগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—জ্বালানি উৎপাদনকারী এবং জ্বালানি আমদানিকারক। সুতরাং, আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এর কারণ, কোনো দেশ ইচ্ছামতো বাইরে থেকে জ্বালানি আমদানি করতে পারে না। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের জন্য দরকার পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, পেট্রোডলার বা তেল সংরক্ষণের মজবুত অবকাঠামো, উন্নত পরিশোধন ক্ষমতা এবং সরবরাহ চেইনের অবিচ্ছিন্নতা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। এই সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমদানিকারক দেশগুলোতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং বিশ্বব্যাপী তেলের তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়।
আমাদের যেহেতু কোনো তেলখনি নেই, তাই দেশীয় তরল জ্বালানি দিয়ে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য আমদানির উৎস খুঁজতে হবে, যেখান থেকে সময়মতো জ্বালানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি থাকে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। দেশে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তবে খনিজ তেলের কোনো উল্লেখযোগ্য উৎস নেই। গ্যাস উত্তোলনের সময় কিছু কনডেনসেট পাওয়া যায়, যা ফ্র্যাকশনেশনের মাধ্যমে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও এলপিজিতে রূপান্তরিত হয়ে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র কার্যকর। এর মধ্যে ২০টি থেকে নিয়মিত উৎপাদন চলছে। রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড এবং বাপেক্স এই উত্তোলনে জড়িত। এছাড়া বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিও অংশ নিচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, আবিষ্কৃত মোট গ্যাস ২৮.৭৯ টিসিএফ। এর মধ্যে ২০.৩৩ টিসিএফ উত্তোলিত হয়েছে, অবশিষ্ট ৮.৪৬ টিসিএফ।
দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৩.৮০ বিসিএফ। দেশীয় উৎপাদন গড়ে ১.৮ বিসিএফ এবং এলএনজি থেকে ১ বিসিএফ। ফলে দৈনিক ১ বিসিএফ-এর ঘাটতি।
তরল জ্বালানিতে আমরা প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। মূলত সৌদি আরব, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি। এতে সরাসরি ফিনিশড প্রোডাক্ট এবং ক্রুড অয়েল। ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বা ইআরএল-এ পরিশোধিত হয়। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড মোট চাহিদার ১৪-১৬% অকটেন, ২৪-২৬% পেট্রল, ০.১-০.২% ডিজেল ও ১৫-১৬% কেরোসিন মেটাতে পারে। কিন্তু আমাদের যেহেতু কোনো তেলখনি নেই, তাই দেশীয় তরল জ্বালানি দিয়ে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য আমদানির উৎস খুঁজতে হবে, যেখান থেকে সময়মতো জ্বালানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি থাকে।
দেশে ৩৫-৪৫ দিন চলার জ্বালানি সংরক্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। সাধারণত সরবরাহ চলতে থাকে এবং নতুন চালানে মজুত পূরণ হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় চালান আটকে গেলে মজুত কমে ১৫ দিনের ডিজেল, ১৫-১৭ দিনের পেট্রল ও ২৪ দিনের অকটেনে নেমে আসে।
এতে জনমনে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়, অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা দেখা যায়। কেউ গুজব ছড়ায়, সিন্ডিকেট অবৈধ মজুত গড়ে। তবে তেল সরবরাহ একটি প্রবহমান প্রক্রিয়া। গুদামের মজুত কমলেই সংকট নয়, কারণ চালান পথে থাকলে বিদ্যমান মজুত দিয়ে চলে। সাধারণ মানুষের কারিগরি জ্ঞানের অভাবে আতঙ্ক তৈরি হয়।
প্রথমত, সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ-এর মতে, ৯০ দিনের সংরক্ষণ নিরাপদ। আমাদের ৩৫-৪৫ দিন। অবিলম্বে এটি বাড়ানো জরুরি।
দ্বিতীয়, বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে।
তৃতীয়, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পুরোনো কূপগুলো ওয়ার্কওভার করে চালু করা, অফশোর অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস সংযোগ এবং বাপেক্সের আধুনিকীকরণ জরুরি।
চতুর্থ, ভূতাত্ত্বিক তথ্যমতে, দেশের কয়লা ১৮৮ টিসিএফ গ্যাসের সমান। পাঁচটি খনি থাকা সত্ত্বে একটি ছাড়া উত্তোলন নেই। দেশীয় কয়লা উত্তোলনে মনোযোগ দিতে হবে।
পঞ্চম, একাডেমিয়া, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে গবেষণা করে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার রোডম্যাপ তৈরি করবে।
ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম; আবু সাঈম বিশ্বাস; মো. মিজানুর রহমান; নাদিয়া মাহজাবিন; আকিফ হোসেন খান; অমিত দাশ; বিনতুন জামান; মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম; মো. রাসেল রানা এবং শ্রাবনী তালুকদার। তাঁরা সবাই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক।
মতামত লেখকদের নিজস্ব






