জনপরিসরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে আলোচনা সাধারণত দুটি বিষয়কেন্দ্রিক—নতুন সমরাস্ত্র ক্রয় এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের বরাদ্দ। কতগুলো নতুন বিমান কেনা হলো, কত যুদ্ধজাহাজ বহরে যুক্ত হলো, বাজেটে প্রতিরক্ষার অংশ বাড়ল কি কমল—এসবই সংবাদের শিরোনাম জুড়ে থাকে।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে: এই ব্যয় কি দেশের অভ্যন্তরে শিল্প, প্রযুক্তি বা গবেষণার ভিত গড়ে তুলছে?

উত্তর সন্তোষজনক নয়। প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনায় চলে যায়। স্বল্পমেয়াদে এতে নতুন সক্ষমতা যোগ হয় ঠিকই, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় প্রযুক্তিশিল্প, উদ্যোক্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিকাশের সুযোগ অব্যবহৃত থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে অনেক দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয়কে নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্প বিকাশের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশের জন্যও এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সময় এসেছে।

এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন, যার লক্ষ্য কেবল সরঞ্জাম কেনা নয়, বরং দেশীয় প্রতিরক্ষাশিল্প ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে ‘আর্মড ফোর্সেস-ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া নেক্সাস’ নামে একটি সহযোগিতা কাঠামো গড়ে ওঠে।

এই মডেলের মূল ধারণা সরল: প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রযুক্তিগত সমস্যা ও চাহিদা চিহ্নিত করে, সরকার তার ভিত্তিতে গবেষণা তহবিল দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমাধান খুঁজে। সফল প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যবহার করে এবং প্রায়শই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়।

এর সুবিধা বহুমুখী। সরকারি অর্থ দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাস্তব প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ইন্টারনেট, জিপিএস, স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো প্রযুক্তির বেশিরভাগ বিকাশ প্রতিরক্ষা গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ থেকে শুরু হয়েছে। অনেক বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি কোম্পানির প্রথম বিনিয়োগও এসেছে সামরিক গবেষণা থেকে।

প্রতিরক্ষা ব্যয়কে শুধু খরচ হিসেবে দেখার দিন ফুরিয়ে আসছে। যে দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতকে উদ্ভাবন ও শিল্প বিকাশের ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে, তারা কেবল সামরিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে গেছে।

এখন বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলো প্রতিরক্ষা উদ্ভাবনে যুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্মল বিজনেস ইনোভেশন রিসার্চ (এসবিআইআর) এবং স্মল বিজনেস টেকনোলজি ট্রান্সফার (এসটিটিআর) কর্মসূচি স্টার্টআপগুলোকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে অর্থায়ন করে। কানাডার ইনোভেশন অপর ডিফেন্স এক্সসিলেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি (আউডিইএএস) প্রোগ্রাম বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষায় সাহায্য করে। সম্প্রতি ন্যাটো ডিফেন্স ইনোভেশন এক্সিলেটর ফর দ্য নর্থ আটলান্টিক চালু করেছে প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে।

এসব কর্মসূচির মূল সূত্র: প্রতিরক্ষা বাহিনী সব প্রযুক্তি নিজেরা তৈরি করে না, বরং সমস্যা চিহ্নিত করে বেসরকারি খাতকে চ্যালেঞ্জ দেয়, সরকার প্রকল্পে অর্থায়ন করে এবং উন্মুক্ত বাজার তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় এখনো ক্রয়কেন্দ্রিক। প্রযুক্তি বিদেশ থেকে কেনাই প্রধান ধারা, যা দ্রুত সক্ষমতা বাড়ায় কিন্তু দেশীয় শিল্প-গবেষণা ইকোসিস্টেম গড়তে পারে না।

তবে সম্ভাবনা প্রচুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল-প্রযুক্তি গবেষক আছেন, আইটি, ইলেকট্রনিকস, রোবোটিক্সে ছোট উদ্যোক্তা বাড়ছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে তাদের সংযোগ নেই, ফলে বাজেটের অর্থ দেশীয় গবেষণায় কাজে লাগছে না।

বিশ্বের প্রতিরক্ষা সাপ্লাই চেইনে বড় পরিবর্তন চলছে, বিশেষ করে ড্রোনশিল্পে। ন্যাটো দেশগুলো চীনা প্রযুক্তির নির্ভরতা কমাতে কম খরচে উপাদান তৈরির দেশ খুঁজছে। প্রতিবেশী ভারত ড্রোন উন্নয়নে বিনিয়োগ করে স্টার্টআপকে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশের জন্যও সুযোগ আছে, তবে সময় সীমিত।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনের সঙ্গে চুক্তিতে ড্রোন উৎপাদন-সংযোজন শুরু করেছে। এটি স্বল্পমেয়াদে প্রযুক্তি আনে, কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজে উৎপাদন করলে বেসরকারি শিল্প ও গবেষণার ইকোসিস্টেম গড়া কঠিন হয়।

উন্নত দেশগুলো সরকারকে উৎপাদক নয়, উদ্ভাবনের পৃষ্ঠপোষক করে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায় রূপান্তর করতে চাইলে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি প্রণয়ন জরুরি। এর চার স্তম্ভ: প্রথম, প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন তহবিল গঠন যাতে স্টার্টআপ-গবেষকরা সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করতে পারে।

দ্বিতীয়, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে প্রতিরক্ষা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, উপাদানপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অবদান সম্ভব।

তৃতীয়, বেসরকারি শিল্পকে সাপ্লাই চেইনে যুক্ত করতে নীতি সহায়তা ও ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফান্ড।

চতুর্থ, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতিতে বৈশ্বিক বাজারে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি।

প্রতিরক্ষা ব্যয়কে শুধু খরচ হিসেবে দেখার দিন ফুরিয়ে আসছে। যে দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতকে উদ্ভাবন ও শিল্প বিকাশের ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে, তারা কেবল সামরিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে গেছে।

ড্রোন, রোবোটিক্স, এআই-ভিত্তিক উদ্ভাবনের কারণে প্রতিরক্ষাশিল্পে খোলামেলা পরিবর্তন চলছে। বাংলাদেশের সুযোগ এসেছে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের। প্রয়োজন সাহসী নীতি ও উদ্যোগ—প্রতিরক্ষা ব্যয়কে সরঞ্জাম কেনা থেকে দেশীয় প্রযুক্তি বিনিয়োগে রূপান্তর করতে। সেই সময় এখনই।

  • গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজীম, অর্থনীতিবিদ, কানাডার ডিপার্টমেন্ট অব ন্যাশনাল ডিফেন্সে কর্মরত

    মতামত লেখকের নিজস্ব