আর কয়েক সপ্তাহ পরেই জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসছে।

তবে সকলে একমত যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রণীত হচ্ছে। একদিকে ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধাবস্থার কারণে জ্বালানি সমস্যা ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি দেখা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক সংকটের অংশ। অন্যদিকে দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিপুল ঋণের বোঝা, ভর্তুকির চাপ এবং সম্পদের ঘাটতি সত্ত্বেও ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলছে। এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বাজেট তৈরি হচ্ছে।

এ কঠিন সময়ে বাজেটের তিনটি সামগ্রিক দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাজেটের মূল দর্শন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কোন লক্ষ্য ও প্রেক্ষিত সামনে রেখে তৈরি হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।

কোনো দেশের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব বা গাণিতিক প্রক্রিয়া নয়। এটি ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়ন দর্শন ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের আনুষ্ঠানিক দলিল। সাধারণ মানুষ চায়, আগামী বাজেটে সরকারের এ দর্শন ও অগ্রাধিকার পরিষ্কার ও সরলভাবে উপস্থাপিত হোক, যাতে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, জনজীবনের প্রত্যাশা। বাজেট সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষামুখী হতে হবে। জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছে মানুষ, বাজেটে তার প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টি থাকা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে সেগুলো পূরণের জন্য অর্থ বরাদ্দ ও নির্দেশিকা নিশ্চিত করতে হবে। এতে সরকারের দায়বদ্ধতা প্রমাণিত হবে।

তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির নির্দিষ্ট সমস্যার দিকে নজর দেওয়া অপরিহার্য। বর্তমান সংকটের সমাধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সম্পদ বরাদ্দ থাকতে হবে। জনকল্যাণ ও নাগরিকদের কল্যাণ এর ওপর নির্ভরশীল। বাজেটে স্পষ্ট হওয়া উচিত, সরকার মানব উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবে নাকি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে। এটি দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে নাকি ধনী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করবে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবকল্যাণ নাকি বস্তুগত সমৃদ্ধি, তা স্পষ্ট করতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর পরিমাণ ও গুণগত মান নিয়ে জনগণের অসন্তোষ প্রবল। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই খাতগুলোতে আমাদের বরাদ্দ অনেক কম। জাতীয় আয়ের মাত্র ৩ শতাংশের নিচে এসব খাতে ব্যয় করা হয়, অথচ মানুষের প্রত্যাশা এটি অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত হোক। বাজেটে এই প্রতিফলন দেখা জরুরি।

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাজেটে দুটি বিষয়ের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং। সম্পদ অপ্রতুল হওয়ায় বাজেটের আকার অতিরিক্ত বড় করা যাবে না, তবে অতিরিক্ত রক্ষণশীলও হওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি সংকুচিত করতে পারে। তাই বাজেটের আকার স্থিতিশীল রাখতে হবে।

এ ভারসাম্যের জন্য বড় মর্যাদামূলক প্রকল্প সাময়িকভাবে স্থগিত বা কাটছাঁট করতে হতে পারে। ‘প্রয়োজনীয়’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’-এর মধ্যে লাইন টানতে হবে। উৎপাদনমুখী প্রকল্পের পাশাপাশি করকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে জোর দিতে হবে।

অর্থনৈতিক স্বস্তির জন্য সুনির্দিষ্ট দাবি উঠছে। জ্বালানিসংকট জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে। সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা ও মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনার ঘোষণা আশা করা হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত দুই বাজেটে কার্যকর ফল দেখায়নি। নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা এখন বেশি। মূল্যস্ফীতি একেবারে কমবে না, তবে হ্রাসের প্রবণতা দেখালে মানুষ আশ্বস্ত হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জাতীয় আয়ের মাত্র ৩ শতাংশের নিচে ব্যয় হয়, মানুষ চায় অন্তত ৫ শতাংশ। বাজেটে এ প্রতিফলন জরুরি।

সামগ্রিকভাবে বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এটি মূল্যস্ফীতি কমানো, বাণিজ্যঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণশর্ত পূরণ ও অর্থনীতির প্রসারের জন্য দরকার। শুধু রক্ষণশীল মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, তা প্রমাণিত। রাজস্ব নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সমন্বয় থাকতে হবে। বাণিজ্যঘাটতি কমাতে রপ্তানি বাড়ানো ও আমদানির বিকল্প খোঁজা জরুরি।

বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির বিকল্প নেই। বৈষম্য দূর করতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিস্তার দরকার। তরুণ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি থাকতে হবে। কৃষি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশের টেকসই ভারসাম্যে বিশেষ বরাদ্দ জরুরি।

কিন্তু বাস্তবায়নে অর্থায়ন বাধা। ব্যয়ে ঋণ-সুদ ও ভর্তুকির চাপ, আয়ে করব্যবস্থার অদক্ষতা ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা। প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত না করলে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। পোশাকশিল্পের শ্লথতা, বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতি ও প্রবাসী আয় হ্রাস বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ জটিল করতে পারে।

পরিশেষে, বাজেটের প্রাক্কলন বাস্তবসম্মত হতে হবে। প্রতিটি কর্মসূচি ও প্রকল্পের জন্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামো থাকতে হবে। সংকট নিরসনে কার্যকর বাজেট কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।

  • সেলিম জাহান জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব