জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় বহুদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি মো. নুরনবী সরকার ওরফে ‘কিডনি নুরনবী’কে ঘিরে আবারও নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কিডনি পাচার, মানবপাচারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে আগে থেকেই অভিযুক্ত এই ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এবার সরাসরি পুলিশ কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আইনি জটিলতায় পড়েছেন।

স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নুরনবী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের টার্গেট করতেন। ঋণ পরিশোধ, বিদেশে কাজের সুযোগ কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলে কিডনি পাচারের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সাম্প্রতিক অভিযোগ: প্রলোভন, অপারেশন ও ভয়ভীতি
সাম্প্রতিক ঘটনায় রাসেদ মিয়া নামের এক যুবক অভিযোগ করেন, তাকে ঋণের চাপ থেকে মুক্তির আশ্বাস দিয়ে কিডনি অপসারণে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনায় জয়পুরহাট আমলি আদালত-৫-এ নুরনবীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

তবে মামলার অল্প সময়ের মধ্যেই বাদীর ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, নুরনবীর প্রভাব ও ভয় দেখানোর কারণে শেষ পর্যন্ত বাদী আপসনামার মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন—যা পুরো ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

পুলিশকে হুমকি—নতুন বিতর্ক: শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিও অশোভন আচরণ ও সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নুরনবীর বিরুদ্ধে। কালাই থানার একাধিক কর্মকর্তাকে অপমান করা এবং ‘ফ্যাসিস্ট অফিসার’ বলে সম্বোধন করার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

এ ঘটনায় কালাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং তা আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে কিডনি পাচার সংক্রান্ত বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক পরিচয় বদল ও বিতর্ক: অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত এক যুগ ধরে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে নুরনবী প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। বিভিন্ন মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে নীল পাঞ্জাবি পরে ফুল দিয়ে সাজানো নৌকা হাতে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নতুন করে বিএনপির অঙ্গসংগঠনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি কালাই উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে সদস্য করা হলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই কমিটি বাতিল করা হয়।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নুরনবী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং তাকে “সুযোগসন্ধানী অপরাধী” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

পুরনো অভিযোগের পাহাড়: স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, নুরনবীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই হত্যা চেষ্টা, অবৈধ অস্ত্র রাখা, মানবপাচারসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তবে নানা সময়ে প্রভাব খাটিয়ে এসব অভিযোগ থেকে পার পেয়ে যাওয়ার কথাও শোনা যায়।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা: কালাই ও আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নুরনবীকে নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি—এই ধরনের প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।

স্থানীয়রা জোর দিয়ে বলছেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবির ছাড়াই ‘কিডনি নুরনবী’কে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।