চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে সকাল ছয়টা থেকে বার্ডিংবিডি ট্যুরসের সঙ্গে ছয়জনের একটি দল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তারিখ ছিল চলতি বছরের ২৭ মার্চ। বনের গভীরে মুরগিজাতীয় ছোট পাখি সাদাগলা তিতিরের অপেক্ষায় ঘণ্টাখানেক ঘাপটি মেরে বসে ছিলাম। পাখিটির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম আশপাশে, কিন্তু শেষমেশ দেখা দিল না। লালমাথা ট্রোগনের ডাকও কানে এল, তবে সেটিও প্রকাশ পেল না। পরে প্রাতরাশের জন্য গেস্টহাউসে গিয়ে নাশতা সেরে ছড়ার দিকে রওনা দিলাম।

এখানকার ছড়া বেশ চ্যালেঞ্জিং! কোথাও পায়ের পাতা ভিজে যায়, কোথাও হাঁটু জলে ডুবে, আবার এক জায়গায় কোমরপানি অতিক্রম করতে হয়। গতকাল ছড়ার শুরুতে কালোঘাড় টুনটুনি সহ কয়েকটি ছোট পাখি দেখা গেলেও আজ তাদের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। কিছু দূর এগিয়ে লেবুবাগানে পৌঁছাতেই বার্ডিংবিডির জাবের আনসারি একটি গাছের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন। সেখানে বুক-পেট-লেজে সাদা-কালো দাগযুক্ত কালচে ধূসর ও সাদাটে একটি সুন্দর পাখির দেখা মিলল। পাখিটি অবিরাম ডাকছিল। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে দ্রুত তার কয়েকটি ছবি তুললাম এবং ভিডিওও করলাম।

১৫ বছর আগে, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো একই প্রজাতির পাখি আমার কর্মস্থল গাজীপুরের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিদ্যুতের তারের ওপর বসে দেখেছিলাম। ভাগ্য যে সুপ্রসন্ন ছিল, সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। তবে মাত্র দুটি ছবি তুলতেই পাখিটি উড়ে চলে গেল এবং আর ফিরে এল না। তাই এতদিন পর হাজারিখিলে এই পাখিকে পেয়ে মনের মতো ছবি তোলার সুযোগ হল।

হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও গাজীপুরের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা এই পাখিটি বাংলাদেশের এক বিরল পন্থ-পরিযায়ী (Passage Migrant) পাখি, গায়ক কোকিল। পন্থ-পরিযায়ী পাখি বলতে বোঝায় সেইসব পাখিকে, যারা অন্য দেশে পরিযায়নের পথে স্বল্পস্থায়ী বিশ্রামের জন্য তৃতীয় কোনো দেশে যায়। যেমন বাদামি চটক, বনখঞ্জন, লাল-পা তুরমতি ইত্যাদি। এরা মূলত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে পরিযায়নপথে এ দেশে যাত্রাবিরতি করে এবং ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে মূল দেশে ফেরার সময় আরেকবার এখানে থামে। গায়ক কোকিলের ইংরেজি নাম কমন বা ইউরেশিয়ান কাক্কু। পরাভৃত বা কুকুলিডি গোত্রের এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Cuculus canorus। এরা মূলত ইউরোপ, চীন, হিমালয় ও জাপানের আবাসিক পাখি। শীতে সাব–সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিযায়ী হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক গায়ক কোকিলের দেহের দৈর্ঘ্য ৩৩–৩৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৫৪–৬০ গ্রাম। একনজরে এটি ধূসররঙা পাখি। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের দেহের উপরিভাগ ধূসর, দেহতল সাদা। থুতনি, গলা ও বুক ফ্যাকাশে ছাই। পেট, বগল, অবসারণী ও লেজতল ঢাকনির ওপর সরু কালো ডোরা রয়েছে। লেজ কালচে বাদামি, যার আগা সাদা। স্ত্রীর পালক দুই ধরনের হয়। প্রথম ধরনের ক্ষেত্রে ধূসর বুকের নিচের প্রান্তদেশে লালচে ভাব ছাড়া বাকি সব পুরুষের মতো। দ্বিতীয় ধরনের স্ত্রীর লেজসহ পিঠ লালচে বাদামি, যাতে কালচে বাদামি ডোরা থাকে। কালচে ডোরাসহ দেহতল সাদা। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে চোখ, পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলুদ; নখ ধূসর বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি স্লেট-ধূসর; ঘাড়ের পেছনে সাদা তিল থাকে এবং পালকে সাদা পাড় রয়েছে।

এসব পাখি কালেভদ্রে সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা বিভাগে দেখা যায়। এরা সাধারণত মিশ্র চিরসবুজ বন, আর্দ্র পাতাঝরা বন ও গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকায় একাকী ঘুরে বেড়ায়। দিবাচর এই পাখিরা মূলত শুঁয়াপোকা ও নরম দেহের কীটপতঙ্গ খায়। পুরুষ ‘কুক-কু—কুক-কু—-’ এবং স্ত্রী ‘হুয়ি-হুয়ি-হুয়ি—-’ স্বরে ডাকে।

মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এরা প্রজনন পরজীবী পাখি। তাই প্রজননসময় মূল আবাস এলাকায়, যেমন সাইবেরিয়া ও হিমালয়ে, ছোট আকারের পাখি যেমন খঞ্জন, তুলিকা, চটক ইত্যাদির বাসায় ডিম পাড়ে। স্ত্রী পাখি বছরে অন্তত ১২টি পোষকের বাসায় একটি করে ১২টি ডিম পাড়ে। ডিমের রং পোষকের ডিমের কাছাকাছি হয়। পোষকের ডিমের আগে (প্রায় ১২.৫ দিনে) এদের পাড়া ডিম ফোটে। ছানাগুলো ২২-২৩ দিনে ধাত্রী মা-বাবার থেকে কয়েক গুণ বড় হয়ে যায়। আয়ুষ্কাল কমবেশি সাত বছর।

  • আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ