প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ১৯১৯ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লিমেন্সু এক উক্তিতে যুদ্ধ পরিচালনায় বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের টানাপোড়েন তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যুদ্ধ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেটি শুধু জেনারেলদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।” এই কথা তাঁর সঙ্গে ফরাসি সেনাপ্রধান ও মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম অধিনায়ক মার্শাল ফারদিনান্দ ফসের সম্পর্কের তিক্ততা প্রকাশ করে।
প্রুশীয় সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজউইৎজ যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করে বলেছেন, যুদ্ধ একটি রাষ্ট্রের রাজনীতির লক্ষ্য অর্জনের বিকল্প ব্যবস্থা (কন্টিনিউয়েশন অব পলিটিকস বাই আদার মিনস)। তাই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সমাপ্তি—এসব রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব, সামরিক নেতৃত্বের নয়।
আর্ট অব ওয়ার নিয়ে লেখক সান জু (৫৫৪ খ্রিষ্টপূর্ব) এবং কার্ল ফন ক্লজউইৎজ (১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ) কয়েক হাজার বছরের ফারাক সত্ত্বেও একই বিষয়ে জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। রাষ্ট্রের সাফল্য সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল।
ইরান যুদ্ধে ক্লজউইৎজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুল। এই ভারসাম্য যেকোনো রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জনের চাবিকাঠি। সামরিক বাহিনী বেসামরিক নেতৃত্বে পরিচালিত হবে, নইলে ভারসাম্য অসম্ভব। এই দুটি বিষয় পারস্পরিক সাংঘর্ষিক মনে হলেও আসলে সম্পূরক। রাষ্ট্রনায়ক রাজনীতিতে পারদর্শী এবং সামরিক বিষয়ে জ্ঞানী হবেন; সমরনায়ক সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী কিন্তু রাজনীতিতে অবগত।
এমন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রনায়ক যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেবেন বুঝেশুনে। যুদ্ধের সময়, উদ্দেশ্য, অর্জনযোগ্য লক্ষ্য এবং সমাপ্তির শর্ত নির্ধারণ করবেন, সমরনায়কদের পরামর্শ নিয়ে। এসব ছাড়া যুদ্ধে জড়ালে জয় অসম্ভব।
সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামরিক নেতৃত্বের কার্যকর সমন্বয়ের অংশ। এর ওপর রাষ্ট্রের সক্ষমতা নির্ভরশীল। সামরিক বিষয় উপেক্ষা করে যুদ্ধে নামা আত্মহত্যা; সমরনায়কদের উপদেশ অগ্রাহ্য করে লক্ষ্যহীন যুদ্ধ থেকে বেরোনো কঠিন।
সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের আদর্শ উদাহরণ ১৯৭১ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশের। চাকরিচ্যুতির ভয় সত্ত্বেও জেনারেল মানেকশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুর্বলতা তুলে ধরেন এবং প্রস্তুতি ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কা জানান।
ইন্দিরা সেনানায়কের উপদেশ মেনে যুদ্ধের সময় পিছিয়ে দেন, সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতির সুযোগ দেন, আহত-নিহতের জন্য সরকারি সহায়তার নিয়ম বদলান এবং বাজেট বরাদ্দ করেন। এতে সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়ে, সরকারের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পায়। মাত্র ১২ দিনে যুদ্ধ শেষ হয়ে ভারতীয় বাহিনী বিজয়ী হয়।
১৯৯১ সালের ডেজার্ট স্টর্ম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনী বিতাড়িত করে, কিন্তু পুরো ইরাক দখলের পরিকল্পনা না থাকায় জেনারেল সোয়ার্জকফ সবাইকে নিরুৎসাহিত করেন। কুয়েত মুক্ত হলে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করা হয়।
মৃত্যু–উপত্যকার মুখে আবারও কি ‘ভুল’ করছে পেন্টাগন। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে কার্থেজ (বর্তমান তিউনিসিয়া) সিনেট হ্যানিবলকে লোকবল, নৌবাহিনী সাহায্য না পাঠিয়ে রোম দখলের ভয়ে বাধা দেয়। সাহায্য পেলে হ্যানিবল রোম পরাজিত করতে পারতেন, হয়তো ইতিহাস বদলে যেত। ৫০-৬০ বছর পর তৃতীয় পিউনিক ওয়ারে রোম কার্থেজকে ধ্বংস করে।
ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের পরাজয়কে অনেক লেখক যুক্তরাষ্ট্রের অকার্যকর সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করেন।
ইরান যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথ প্রমুখের কথা শুনে মনে হয়, তারা মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই অন্য রাষ্ট্রের প্ররোচনায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন। এক সপ্তাহের প্রস্তুতি ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধ শেষের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়। এখন যুদ্ধ সপ্তাহ পেরিয়ে মাস শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান নেতৃত্বের হাতে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনীর পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলা বাগধারায় ‘বানরের গলায় মুক্তার হার’, ট্রাম্প ও হ্যাগসেথের নেতৃত্বে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থা একই।
মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত না হলে কেউ যুদ্ধকে সপ্তাহান্তে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার এক্সকারশনের সঙ্গে তুলনা করতে পারে? শত্রুকে হত্যা করাকে ‘ফান’ হিসেবে উল্লেখ করতে পারে? কেউ কি বলতে পারে যে ইরান নিজেই টোমাহক (যা মার্কিনদের হাতে ছাড়া আর কারোর কাছে নেই) বালিকা বিদ্যালয়ে ব্যবহার করে ১৭০ জন শিশুকে হত্যা করেছে। ঘটনাটি হৃদয়বিদারক, কিন্তু তিনি শুধু মিথ্যা বলে ক্ষান্ত নন, শিশুদের অকালমৃত্যুতে বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করেননি।
যুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে ট্রাম্পের হাসিঠাট্টা বর্ণনাতীত। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত না হলে কেউ যুদ্ধকে সপ্তাহান্তে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার এক্সকারশনের সঙ্গে তুলনা করতে পারে? শত্রুকে হত্যা করাকে ‘ফান’ হিসেবে উল্লেখ করতে পারে? কেউ কি বলতে পারে যে ইরান নিজেই টোমাহক (যা মার্কিনদের হাতে ছাড়া আর কারোর কাছে নেই) বালিকা বিদ্যালয়ে ব্যবহার করে ১৭০ জন শিশুকে হত্যা করেছে। ঘটনাটি হৃদয়বিদারক, কিন্তু তিনি শুধু মিথ্যা বলে ক্ষান্ত নন, শিশুদের অকালমৃত্যুতে বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করেননি।
‘উইল টু ফাইট’: যুদ্ধে কেন ইরানই জয়ী হবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম নামক কঠিন রোগে আক্রান্ত। হিটলারেরও একই রোগ ছিল। এটি নার্সিসিজমের গুরুতর রূপ, যাতে অসামাজিক আচরণ, স্যাডিজম এবং প্যারানয়ার মিশে যায়। লক্ষণগুলোর মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্বে চরম বিশ্বাস, সহানুভূতির অভাব, কৌশলী আচরণ, অন্যের কষ্টে আনন্দ এবং তীব্র প্রতিশোধপরায়ণতা। ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা নির্মম হয়।
তাই ট্রাম্প হ্যাগসেথের মতো দ্বিমতপোষণকারীদের মন্ত্রী করেছেন। বিমানবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেলকে পদোন্নতি দিয়ে জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ বানিয়েছেন, যিনি দক্ষ পাইলট কিন্তু স্থলযুদ্ধে অভিজ্ঞ নন। সেনাবাহিনী প্রধানসহ এক ডজন জেনারেলকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক মধুর নয়। ইতিহাসের নিয়ম ভাঙলে যুদ্ধে জয় সম্ভব নয়।
জর্জ ক্লিমেন্সুর উক্তির রেশ ধরে বলা যায়, “যুদ্ধ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেটি শুধু রাজনৈতিক নেতাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।” এই যুদ্ধের পরিণতি শুধু সামরিক পরাজয় নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে অবস্থানের বিলুপ্তি হবে।
তুষার কান্তি চাকমা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব






