ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি? অনেকে হয়তো ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০ মিটারে সোনার কথা বলতেন। কিন্তু অ্যাডাম জেমিলি ভিন্নমতের। তাঁর কাছে লন্ডনের ২০১৭ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রিলে জয়ের সেই অবিশ্বাস্য রাতই সবচেয়ে প্রিয়। কারণ? জেমিলি মূলত একজন ‘টিম ম্যান’। একা দৌড়ানোর চেয়ে দলগত লড়াইয়েই তাঁর আনন্দ বেশি।
স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৩২ বছর বয়সী জেমিলি সেই সোনালি স্মৃতির কথা স্মরণ করেন, ‘যদি জীবনে কোনো একটা রাত আবার ফিরে পেতে চাইতাম, তবে সেটা ওই রাতটা। ইতিহাসের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আমার বাবা-মায়ের ফোনে তোলা সেই দৌড়ের ভিডিওগুলো এখনো দেখি। ওটা ছিল উসাইন বোল্টের শেষ রেস। গ্যালারিভর্তি দর্শকের সামনে ঘরের মাঠের সেই জয় ছিল অবিশ্বাস্য।’
জেমিলি বলছিলেন, ‘কাগজে-কলমে আমরা হয়তো চারজন দ্রুততম দৌড়বিদ ছিলাম না। কিন্তু ওই স্টেডিয়ামে দল হিসেবে আমরাই ছিলাম সেরা। জ্যামাইকানরা ছিল, আমেরিকানরা ১০০ মিটারে সোনা-রুপা জিতেছিল। অ্যাথলেটিকস মূলত একা লড়ার খেলা, কিন্তু রিলেতে যখন সবাই এক হয়ে যায়, তখন বিশেষ কিছু ঘটে। আমরা সেটাই করেছিলাম।’
ট্র্যাকের রাজা হওয়ার অনেক আগে থেকেই জেমিলি ফুটবলের প্রেমিক ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত চেলসির একাডেমিতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। ২০১২ অলিম্পিকে ডাক পাওয়ার সময় তাঁর বয়স মাত্র ১৮। তখনো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। অলিম্পিক তাঁর জীবনের পথ বদলে দিলেও ফুটবলের অপূর্ণতা এখনো তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ে। যেন এক ‘একাডেমি রিজেক্ট’ কিশোরের মতো, যার স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই থমকে গিয়েছিল।
‘ফুটবল খেলেই বড় হয়েছি, ওটাই আমার চেনা জগৎ ছিল। কিন্তু স্বপ্নটা সত্যি হয়নি। আমার স্বপ্ন ছিল ইংল্যান্ডের জার্সি পরা কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই বিখ্যাত সুরটা মাঠে দাঁড়িয়ে শোনা। চেলসির বল বয় থাকার সময় ওই সুরটা শুনলে এখনো রোমাঞ্চ জাগে’—স্কাই স্পোর্টসকে বলেন জেমিলি। চেলসি তাঁকে যা শিখিয়েছে—শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব এবং চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রাখা—তা অ্যাথলেটিকসেও কাজে লেগেছে।
অ্যাথলেটিকস থেকে অবসর নেওয়ার পর জেমিলির জীবন যেন এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হল। যে চেলসি থেকে শুরু করেছিলেন, সেই চেলসিতেই এখন ‘স্পিড একাডেমি’র দায়িত্ব পালন করছেন। ক্লাবের ১৩-১৪ বছরের কিশোরদের শেখাচ্ছেন গতি বাড়ানোর কৌশল এবং শরীরের সঠিক ভারসাম্য রেখে দৌড় শুরু করার নিয়ম।
জেমিলি বলেন, ‘সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে একাডেমির ছেলেদের সঙ্গে কাজ করছি। ফুটবলারদের অ্যাথলেট বানানোর প্রয়োজন নেই, কিন্তু সঠিক কৌশলে দৌড়ালে তারা বাড়তি সুবিধা পাবেই। বলের দখল নিতে বা প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলতে ওই কয়েক সেকেন্ডের গতিই পার্থক্য গড়ে দেয়।’
অনেকে মনে করেন গতি জন্মগত। কেউ দ্রুত দৌড়াতে পারে, কেউ পারে না। জেমিলি এতে বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, সঠিক অনুশীলনে গতি এবং শক্তি দুটোই বাড়ানো যায়। পরিসংখ্যান দেখিয়েছেন, দু-তিন মাসের মধ্যে একাডেমির ছেলেদের টাইমিংয়ে অভাবনীয় উন্নতি এসেছে। এমনকি ধীরগতির ছেলেরাও চোখে পড়ার মতো উন্নতি করেছে।
শুধু ছোটরা নয়, বড় তারকাদেরও জেমিলি গতির মন্ত্র দিচ্ছেন। গত গ্রীষ্মে ম্যানচেস্টার সিটির উদীয়মান তারকা রায়ান ম্যাকাইডু এবং আয়ারল্যান্ডের অ্যারন কনোলির মতো খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও গতি বাড়াতে কাজ করেছেন। জেমিলির মতে, ফুটবলারদের ক্যারিয়ার ছোট, তাই তারা গতির ব্যাপারে সচেতন। সঠিক কৌশলে দৌড়লে ইনজুরির ঝুঁকিও কমে।
ট্র্যাকে দৌড়ানোর দিন শেষ হলেও জেমিলির সামনে নতুন অ্যাডভেঞ্চার। ‘স্পিড একাডেমি’র মাধ্যমে ফুটবলের ভোল পাল্টাতে চান তিনি। চেলসির মতো বিশ্বমানের একাডেমির সঙ্গে যুক্ত থাকাকে বড় সম্মান মনে করেন এই ব্রিটিশ তারকা।
ব্যক্তিগত সোনার চেয়ে দলগত সাফল্যেই তাঁর তৃপ্তি। আজও দলগত কাজেই সুখ খুঁজে পান। ট্র্যাকের গতিদানব এখন চেলসির ভবিষ্যৎ তারকাদের গতির দিশারি। মাঠ বদলালেও গতি আর জেদের নেশা একই রয়ে গেছে।
সবশেষে জেমিলির চিরচেনা হাসি বলে দেয়—ট্র্যাক ছিল কর্মক্ষেত্র, কিন্তু ফুটবলের সবুজ ঘাসই তাঁর আসল ঘর।






