আলোচিত মডেল, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনয়শিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ে বা বাগদানের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিনে তুমুল আলোড়ন তুলেছে। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়।
প্রথমে বিয়ের ইঙ্গিত, তারপর তীব্র সমালোচনার মুখে বাগদানের ঘোষণা—এসব থেকে শুরু হয়েছে শিশুবিবাহের পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক। এতে সমাজে এক ধরনের বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণের ছাপ স্পষ্ট।
কিছু সংবাদমাধ্যম এই ঘটনা নিয়ে প্রশংসামূলক সংবাদ প্রকাশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির ফেসবুক পোস্টেও শিশুবিবাহকে প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা হয়েছে। একটি ফৌজদারি অপরাধ এভাবে সামাজিক বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে, এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
শিশুবিবাহ নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য—এসব কথা আজকের বাংলাদেশে অনেকে অস্বীকার করবেন। কিন্তু নৈতিকতার চেয়ে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। শিশুবিবাহ কেন ঘটে, এতে কার লাভ-ক্ষতি এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে এর যোগসূত্র কী—এসব প্রশ্নের উত্তরে তার গভীরতা বোঝা যায়।
শ্রমজীবী থেকে তারকা পরিবার, বাল্যবিবাহ যখন মগজে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্যের মতো সংস্থাগুলো নারী ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
তাতে মাতৃমৃত্যুহার, শিশুমৃত্যুহার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এতে পথিকৃৎ হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ‘বাংলাদেশ মডেল’ নামে স্বীকৃতি পায়। ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকার দেশগুলোতে এটি প্রশংসিত হয়েছে এবং অনেকে এর অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে। নব্বইয়ের দশকে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু হ্রাস ও অপুষ্টি মোকাবিলায় বাংলাদেশ অঞ্চলের শীর্ষে উঠেছে।
গার্মেন্টস খাত, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও শিশুবিবাহ হ্রাসের মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই অর্জন এখন বিপন্ন। ২০২৪ সালের তথ্যমতে, দেশে ৫১ শতাংশের বেশি বিবাহ শিশুবিবাহ। জন্মহার ২ দশমিক ১৭ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছেছে। একই বছর মৃত সন্তান প্রসবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। স্বাধীনতার পর ২০২২ পর্যন্ত মাতৃমৃত্যুহার কমছিল, কিন্তু ২০২৩ থেকে আবার বাড়ছে।
পূর্বাঞ্চলে শিশুবিবাহের হার বেশি, সেখানকার সরকারি হাসপাতালে মাতৃমৃত্যু জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। এসব তথ্য পাশাপাশি রাখলে শিশুবিবাহের সঙ্গে অবুন্নয়নের ছবি স্পষ্ট হয়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ভোটের বয়সসীমা ১৮। এটি শুধু অপরিণতির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র সর্বজনীন মানদণ্ড নির্ধারণ করে যাতে নিচের বয়সে সম্মতিকে আইনত বৈধ না মানা হয়। শিশুশ্রম নিষিদ্ধতার যুক্তিও একই—সম্মতি থাকলেও আইন স্বীকার করে না, কারণ বয়সে মানসিক পরিপক্বতা আসে না। বিবাহেও এটি প্রযোজ্য।
এটি শুধু মানসিক নয়, শারীরিকও। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সন্তানধারণে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। রাষ্ট্র সর্বজনীন বয়সসীমা নির্ধারণ করে এ ঝুঁকি এড়ায়, কারণ প্রত্যেকের আলাদা মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
শুধু আইন কি বাল্যবিবাহ রোধে যথেষ্ট। শিশুবিবাহের প্রভাব নারী-পুরুষের জন্য সমান নয়। শিশুবিবাহ অথবা সার্বিকভাবে বিবাহকে কেবল যৌনমিলন বা সন্তানধারণের জায়গা থেকে দেখলে বিবাহের ধারণাকে ছোট করে দেখা হবে।
বাংলাদেশে বিবাহ সামাজিক চুক্তি, পরিবারের প্রত্যাশা, দেনমোহর-যৌতুকের লেনদেন, স্বর্ণ আদান-প্রদান, পরিবার পরিবর্তনের অভিবাসন। এসব ছেলে-মেয়ের জন্য অসমান। মেয়েরা আর্থসামাজিক পরিণতি বেশি বহন করে। ছেলেদের জীবন বদলায় না, কিন্তু মেয়েরা গৃহস্থালির অদৃশ্য শিশুশ্রম, মাতৃস্নেহ বিচ্ছেদ ও চাপের মুখে পড়ে। বিবাহিত ছেলের বেকারত্ব সমাজ স্বাভাবিক মেনে নেয়, মেয়েদের নয়।
নতুন পরিবারে কন্যাশিশুর উপর শ্বশুরকুলের প্রত্যাশা ও দায়িত্ব পড়ে, পুরুষশিশুর ক্ষেত্রে নয়। ছেলেশিশুর বিবাহ মেয়েশিশুর সঙ্গে হয়, কিন্তু মেয়েশিশুর হয় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে। ফলে শারীরিক-মানসিক চাপ বাড়ে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তরুণদেরও যুক্ত হওয়া উচিত। গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে স্নাতক শেষে তরুণের বয়স ২৫ ছাড়িয়ে যায়, পরিবার চালানোর আয়ে ২৮। ১৮-১৯ বছরে বিবাহ করলে তারুণ্য, শিক্ষা, স্বাবলম্বিতা বিপন্ন হয়। ২৫-এ এক সন্তানের বাবা আর ১৯-এ দুই সন্তানের—তাদের জীবনমান ভিন্ন।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধারণক্ষমতার বহুগুণ মানুষের চাপ পানি-মাটি-বায়ুতে পড়ছে। শিশুবিবাহে ছোটবয়সে বারবার সন্তানজন্ম জনসংখ্যা বাড়ায়, মাথাপিছু সম্পদ কমায়, প্রবৃদ্ধি সংকুচিত করে।
বাংলাদেশে শিশুবিবাহের হার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুমৃত্যুহার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, মাতৃমৃত্যুহার, নারী নির্যাতন মামলার হার, আত্মহত্যার প্রবণতা। আমরা যেন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছি।রাষ্ট্র এ বিষয়ে এখনই কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে না নিয়ে জনতুষ্টিবাদের কাছে নতিস্বীকার করলে ক্ষতি কেবল নাগরিকদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের নিজের উন্নয়ন অভিজ্ঞতাই এই আসন্ন দুর্যোগের সাক্ষ্য দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুবিবাহের প্রচারে নতুন শক্তি যোগাচ্ছে। আগে সংবাদমাধ্যম ছাঁকনি করত, এখন সেই বাধা দুর্বল। ‘প্রাচীন ঐতিহ্য’ ও ‘ধর্মীয় অধিকার’ আবরণে এটি বৈধতা খুঁজছে। লুবাবার ঘটনা এই প্রবণতার অংশ, অনেকে এটিকে ‘নজির’ হিসেবে দেখাচ্ছে।
বিয়ে ১০ মিনিটের নয়, আমৃত্যু চুক্তি। ভুল জীবনসঙ্গী বা পরিবারে বিয়ে হলে সারাজীবন মাশুল দিতে হয়। নির্যাতনকারী স্বামী পেলে সহ্য করতে হয় বা দ্বিতীয় বিবাহে নামতে হয়। এমন সিদ্ধান্তে মানসিক পরিপক্বতা দরকার।
আত্মহত্যা প্ররোচনা, দাঙ্গা আহ্বান, নাশকতা উসকানি দিলে আইনে আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি শিশুবিবাহ প্রচারেও। নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধির উৎসাহে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি।
বাংলাদেশে শিশুবিবাহের হার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুমৃত্যুহার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, মাতৃমৃত্যুহার, নারী নির্যাতন মামলার হার, আত্মহত্যার প্রবণতা। আমরা যেন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছি।
রাষ্ট্র এ বিষয়ে এখনই কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে না নিয়ে জনতুষ্টিবাদের কাছে নতিস্বীকার করলে ক্ষতি কেবল নাগরিকদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের নিজের উন্নয়ন অভিজ্ঞতাই এই আসন্ন দুর্যোগের সাক্ষ্য দেয়।
ইরফান শেখ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব






