গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর তাদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ শুরু করলে, তারা ইরানি জনগণকে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উত্থানের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু শীঘ্রই প্রমাণিত হয়েছে, তারা শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, নাগরিকদের বসবাসস্থল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতেও বোমা হামলা শুরু করেছে।
আজকের এই বোমার ধ্বনিতে অনেক ইরানি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রতিধ্বনি শুনছেন। ১৯৮০ সালের শরতে ইরাক ইরানে আক্রমণ করলে আমি তেহরান পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছর বয়সী ছাত্র ছিলাম। তখন সরকারবিরোধী সংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করছিলাম।
এক সন্ধ্যায় আমার বন্ধু ফারহাদের সঙ্গে সরকারবিরোধী প্যাম্ফলেটভর্তি দুটি বাক্স নিয়ে ইস্পাহান যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে গোলাবর্ষণের প্রচণ্ড শব্দে মাটি কেঁপে উঠল। নীল, কমলা, হলুদ ও লাল রশ্মিতে আকাশ উদ্ভাসিত হলো। সাইরেন বেজে উঠল। আগে কখনো এত ভয়, অসহায়তা ও বিভ্রান্তি অনুভব করিনি। জীবন বাঁচাতে আশ্রয় খুঁজে ছুটছি। দেখছি পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। অবিরাম বিস্ফোরণের শব্দ, আতঙ্কিত জনতার চিৎকার—সব মিলিয়ে মাথায় কিছু এসছে না।
.ট্রাম্পের হুমকি কি ফাঁকা বুলি, নাকি আসলেই ভয়ের?.
সেই সময় বিরোধী গোষ্ঠীতে তীব্র বিতর্ক চলছিল। ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিরোধী আমরা কি ইরাকি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশরক্ষায় অংশ নেব, নাকি যুদ্ধকে সুযোগ করে বিরোধী এজেন্ডা এগিয়ে নেব—এ নিয়ে তর্ক। আমি দ্বিতীয় পক্ষে ছিলাম, অর্থাৎ যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে সরকার উৎখাতের পক্ষে।
সরকার তখন মাত্র এক বছরের। তবু অনেকে তাকে সমর্থন করছিলেন। ইরানিরা অনেকে ভেবেছিলেন, শহরে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে হলে সাধারণ মানুষকে গিয়ে সরকার উৎখাত করতে হবে। কিন্তু এটা ভুল ধারণা ছিল। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন দ্রুত বুঝেছিলেন, বিপ্লবোত্তর বিশৃঙ্খলাতেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র মানুষকে সংগঠিত করে দেশ রক্ষা ও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। নতুন সরকার যতটা দুর্বল মনে হয়েছিল, তারা তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিল এবং জনগণকে একত্রিত করে দেশ রক্ষায় সক্ষম।
পরে আমরাও তা বুঝলাম। ইসলামি প্রজাতন্ত্র শুধু আক্রমণ থামায়নি, বিরোধীদের সরিয়ে শক্তি কেন্দ্রীভূত করতেও সফল হয়েছিল। সে সময় ইরান সরকার ১০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছিল। তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে দেশত্যাগী করেছিল এবং হাজার হাজারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবু বাইরের আক্রমণে সরকারের পতন ঘটেনি।
৪৬ বছর পর দেখছি, আমেরিকান ও ইসরায়েলি নেতারা একই ভ্রান্ত ধারণায় আছেন। তবে সাদ্দামের মতো তারা স্থলসেনা পাঠাননি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুধু বোমাহামলার যুদ্ধ চালাচ্ছেন, কোনো স্থলবাহিনী নেই।
এমন যুদ্ধ আরও অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। যে কেউ, যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে লক্ষ্য হতে পারে। এতে ইরানের সরকারবিরোধীরাও আমেরিকার বিরোধী হয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন সেই বাস্তবতা ভুলে ইসরায়েলের কথায় বিশ্বাস করেছিল যে যুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দ্রুত পতন ঘটবে।
.তিলে তিলে গড়া নৈতিক বিশ্বব্যবস্থা ভাঙতেই কি এই ‘ধর্মযুদ্ধ’.
ইসরায়েলি ও মার্কিন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের দায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও আঞ্চলিক নীতির ওপর চাপাতে চাইছে। কিন্তু রাষ্ট্রের পাপের জন্য জাতিকে শাস্তি দেওয়া যায় না—এটা ইরানিরা বুঝেছে। ফলে দেশের বড় অংশ প্রতিরোধে নেমেছে। এখন স্পষ্ট যে জনজীবনে দুর্ভোগ চাপিয়ে, বোমা মেরে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, হত্যাকাণ্ড করে রাষ্ট্র উৎখাত করা যাবে না।
বেহরুজ ঘামারি–তাবরিজি ইরানি বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ। তিনি দীর্ঘ সময় প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ছিলেন
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
.ইরানে হামলা ও ইসরায়েলি বিলবোর্ডের ‘বারো ভাইয়া’






