রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ৪৪টি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শয্যার আইসিইউ আছে। মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বরাদ্দ। কোনো শয্যাই খালি নেই।
সাত মাসের রাইয়ানের নাকে নল লাগানো। হাতে ক্যানুলা করে স্যালাইন চলছে। তার নানি সালমা বেগম চিন্তিত মুখে বললেন, “শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। ডাক্তাররা আইসিইউ লাগতে পারে বলে বলছে। আমরাও বলছি, আপনাগোর কাছে আসছি, যা করণ লাগে করেন।” গতকাল রোববার দুপুরে শ্যামলীর এই হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে সালমা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। সিরাজগঞ্জ থেকে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি নিয়ে নাতিকে ভর্তি করেছিলেন, পরে হাম ধরা পড়ে। কথা শেষ করে তিনি বললেন, “আমার নাতির জন্য দোয়া করবেন। আমরা যেন নাতিকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি।”
মিরপুর থেকে আসা মোসা. মীম একটু পরপর চোখের পানি মুছছিলেন। ৯ মাস বয়সী সন্তানের ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। কাপড় ভিজিয়ে কপাল ও শরীর মুছছিলেন। অবস্থা খারাপ হওয়ায় নার্স মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে দিয়ে গেলেন। গত ২০ মার্চ থেকে ভর্তি এই মায়ের সঙ্গে কথা বলার সাহস হয়নি।
অপ্রয়োজনীয় গ্যাদারিং বা মানুষ বেশি আছে, এমন জায়গায় শিশুদের নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে গেছে, এমন শিশুদের একদমই বাইরে নেওয়া যাবে না। হাম হোক বা না হোক, এমন শিশুদের স্কুলে পাঠানো যাবে না।
অধ্যাপক মাহবুবুল হক, পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
৯ মাস ৮ দিনের মোহাম্মদ রিসালাতের মাথার অর্ধেক চুল ক্যানুলার জন্য কামিয়ে ফেলা হয়েছে। শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি। নাকে নল লাগানো। সবকিছুতে বিরক্ত হয়ে একটু পরপর নাকের নল খুলতে চায়। স্বজনরা লাল বেলুন ধরে রেখেছেন, তাতে আরও বিরক্ত। শরীর চুলকায় বলে মা খাদিজা হাত ধরে রেখেছেন। খাদিজা ছেলের শরীরে হাত বুলিয়ে দিলে আরাম পায় সে। খাদিজা জানান, নোয়াখালীর দুই হাসপাতাল, ঢাকার আরেকটি ঘুরে ৯ দিন আগে এখানে ভর্তি।
২ বছর ৯ মাসের মীর মোহাম্মদের বিছানায় প্লাস্টিকের ট্রেন, সৈন্যের খেলনা পড়ে আছে। মা হালিমা আক্তার খেলনা দিয়ে খেলতে চায় কি না জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু ছেলে তাকায় না। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে আসা হালিমা বলেন, ছেলে খেতে পারছে না, চোখ লাল। ছয় বছরের আরেক মেয়েকে বাড়িতে রেখে এসেছেন। পুলিশের ইউনিফর্মধারী এক বাবা সন্তানের কান্না থামাচ্ছিলেন। নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি বলেন, অন্য ওয়ার্ডে ভর্তির পর ছেলের হাম হয়েছে। তাঁর মতে, এই হাসপাতাল থেকেই হাম সংক্রমিত হয়েছে।
এভাবেই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে যুদ্ধ করছেন অভিভাবকেরা। গতকাল এখানে হামে আক্রান্ত ৭১ শিশু ভর্তি ছিল। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত শিশুদের অন্য ওয়ার্ডে রাখা যায় না। ৬০টি বিশেষ শয্যায় ভর্তি ছাড়া একক কেবিন, আইসোলেশন ওয়ার্ডেও রাখতে হচ্ছে। ভর্তি না করলে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এমন শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
হাসপাতালের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮৭ শিশু হামে ভর্তি, তিনজন মারা গেছে। গতকাল আইসিইউতে ১৪ শিশুর মধ্যে একজন লাইফ সাপোর্টে, আরেকজনের অবস্থা খারাপ। প্রতিদিন কিছু রোগী সুস্থ হয়ে ফিরছেন, তাই শয্যা পাওয়া যায়। ফলে ফিরিয়ে দেওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি নয়। অন্য শিশুদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হচ্ছে। ভর্তি ১৮৭ শিশুর মধ্যে ১১৮টির বয়স ৯ মাসের কম, পাঁচ বছরের বেশি আটজন। কারা টিকা নিয়েছে, তা জানা যায়নি। ৭৭ শিশুর রক্তের স্যাম্পল জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে, ৬৬টির রিপোর্টে ৩৫টির হাম অ্যান্টিবডি পজিটিভ।
মাস্ক পরে হাম ওয়ার্ডে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গেল। কারও মাথায় বা পায়ে ক্যানুলা। কেউ মুখে খেতে পারে না, নল দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। পরিবারের একাধিক সদস্য দিনরাত হাসপাতালে। খাবার, ওষুধ কেনা নিয়ে খরচ বাড়ছে।
অধ্যাপক মাহবুবুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। অপ্রয়োজনীয় গ্যাদারিং বা মানুষ বেশি আছে, এমন জায়গায় শিশুদের নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে গেছে, এমন শিশুদের একদমই বাইরে নেওয়া যাবে না। হাম হোক বা না হোক, এমন শিশুদের স্কুলে পাঠানো যাবে না। বাবা–মা যদি সন্তান অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে বুঝতে পারেন, হাসপাতালে আনতে হবে। হামে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে, ভিটামিন এ ক্যাপসুল, তরল খাবার খাওয়ানোসহ ডাক্তারের পরামর্শ মানতে হবে। অভিভাবকদেরও মাস্ক পরতে হবে।






